শৈশবের হাতে অপরাধের ছুরি : কোন পথে বাংলাদেশের কিশোরেরা “
** লেখকঃ শান্তা আক্তার **
শিক্ষার্থী, ক্রিমিনোলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
এক সময় যে বয়সে হাতে থাকার কথা ছিলো বই-খাতা, সেই বয়সেই অনেক কিশোরের হাতে উঠেছে দেশীয় অস্ত্র, তুচ্ছ বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, ছিনতাই, চাঁদাবাজী থেকে শুরু করে হত্যার মতো অপরাধেও জড়িয়ে পড়েছে তারা। দেশের বিভিন্ন জেলায় কিশোর গ্যাংয়ের এমন বেপরোয়া কর্মকাণ্ড উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ২০২২ সালের ১৯ আগস্টে কুমিল্লায় ১৫ বছর বয়সী শাহাদাতকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ২০২৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী ভোলায় কিশোর গ্যাং-এর বিরোধ মেটাতে গিয়ে ১৭ বছর বয়সী কলেজ ছাত্র রাব্বিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। চট্টগ্রামে ২০২৪ সালের ৫ এপ্রিল থেকে ৮ জুন পর্যন্ত কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় ৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এছাড়াও ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জে ১৭ বছর বয়সী সোহানকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটে। এছাড়াও গত কয়েক বছরে কিশোর গ্যাং-এর বিরূদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও অপহরণের অভিযোগ ও পাওয়া গেছে এছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বর্তমানে কিশোর অপরাধ ছড়িয়ে পড়ছে।
এখন প্রশ্ন হলো এই অপরাধ গুলো ছড়িয়ে পড়ার কারণ কী? কিশোর অপরাধ বাংলাদেশের একটি প্রধান সমস্যা। এর পেছনে একক কোনো কারণ দায়ী নয়। এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো পারিবারিক অশান্তি ও অভিভাবক এ পর্যাপ্ত নজর দারির অভাব, পরিবারে ঝগড়া-বিবাদ, বিচ্ছেদ ইত্যাদি। অভিভাবকদের অবহেলা কিংবা সন্তানের প্রতি পর্যাপ্ত সময় না দেওয়ার কারণে অনেক কিশোর মানসিক ভাবে একাকী হয়ে পড়ে ফলে তারা বাইরের ভুল মানুষের কাছে আশ্রয় খুজে পায়। সঙ্গ দোষের কারণে অনেক কিশোর অপরাধ জগতে পা রাখে। কিশোর বয়সে বন্ধুদের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। অপরাধ প্রবণ বন্ধুদের সাথে মেলামেশার ফলে একজন কিশোর ধীরে ধীরে মাদক, মারামারি, ছিনতাই বা অন্যান্য অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়তে পারে। অনেক কিশোর খুব অল্প বয়সেই পড়াশোনা থেকে ঝড়ে পড়ে। ফলে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে। পর্যাপ্ত দিক নির্দেশনার অভাবে খুব সহজেই তারা অপরাধ চক্রের সাথে জড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে কিশোররা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে না জেনেই এগুলো ব্যবহার করে। ফলে তারা এর অপব্যবহার এর মাধ্যমে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়। দ্রুত অর্থ ও ক্ষমতা অর্জনের আকাঙ্খা, কিশোর অপরাধের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তাই বলা যায় কিশোর অপরাধ শুধু কিশোরদের ব্যক্তিগত সমস্যায় নয় এর সঙ্গে পরিবারিক সমস্যা, শিক্ষা, বন্ধু, সমাজ, মাদক, প্রযুক্তি এবং সামাজিক পরিবেশ সবকিছুর সম্পর্ক রয়েছে। আবার কিশোর অপরাধের প্রভাবও শুধু একজন কিশোর এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনা। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পুরো সমাজের উপর। অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ফলে কিশোরদের পড়াশোনায়ও ব্যাঘাত ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষা জীবন থেকে ঝড়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ছোটো খাটো অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোর যথাযথভাবে সংশোধন ও পুনর্বাসনের সুযোগ না পেলে আরও গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে পরিবারকে মানসিক চাপ, সামাজিক অস্বস্তি ও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। কিশোর গ্যাং, মাদক, মারামারি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের বিস্তার সমাজে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ায় এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অপরাধ প্রবণ পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তাই কিশোর অপরাধ দমনে শুধু শাস্তি মূলক ব্যবস্থা নয় বরং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নজরদারি, নৈতিক শিক্ষা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ ইত্যাদি নিশ্চিত করতে হবে।
আজকের কিশোরই আগামী দিনের নাগরিক, তাই তাদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা মানে ভবিষ্যৎ সমাজ নিরাপদ করা।
শান্তা আক্তার
শিক্ষার্থী,
ক্রিমিনোলোজি ও পুলিশ সাইন্স বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

