কিশোর অপরাধ ও অপরাধপ্রবণতা ব্রদ্ধির কারণ কি আমরাই?

Spread the love

কিশোর অপরাধ ও অপরাধপ্রবণতা ব্রদ্ধির কারণ কি আমরাই?

গত কিছু বছরে কিশোর অপরাধ এবং অপরাধের প্রবণতা অনেকাংশে বেড়েছে একই সাথে বেড়েছে জন ভোগান্তিও এবং যেখানে অপরাধ কমার কথা সেখানে বাড়ছে কেন?। ২৮ জুন ২০২৫, গোপালগঞ্জে অভিজান চালিয়ে কিশোর গ্যাং “ডেমন বয়েজ” এর ৮ জন সদস্য গ্রেপ্তার করে যৌথবাহিনী। গাজা সেবন এবং গাজা সেবন সরঞ্জাম সহ বেশ কয়েকটি মোবাইল জব্দ করা হয় তাদের কাছ থেকে। ৯ মে ২০২৫, কুমিল্লা থেকে কিশোর গ্যাং এর ২ সদস্য সহ একজন মাদক কারবারি কে আটক করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে দেশীয় অস্ত্র সহ বিভিন্ন প্রকার মাদক দ্রব্য উদ্ধার করে পুলিশকিন্তু তাদের সংশোধন মূলক কোনো তথ্য উল্লেখ করে নি পুলিশ। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, টাকার জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিজিবি সদস্যকে হত্যা করে ৪ কিশোর। এর ১ বছর পর ১৫ সেপ্টেবর ২০২১ সালে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ২৮ জুন ২০২৫, সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছিল একটি ভিডিও যেখানে দেখা যায় গাজীপুরের শ্রীপুরের বাসিন্দা তিহিম মাদবর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে গুলি ছুড়ছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায় তিনি আরো অনেক ধরণের অপরাধ কর্মকান্ডে জোড়িত। তবে এতদ সত্যেও অকে আইনের আওতায় আনা যায়নি। রাজনৈতিক সূত্র ধরে তাকে এধরনের কর্মকান্ড করতে উৎসাহ প্রদান করছিল তারই বাবা। উপরক্ত সকল ঘটনা ঢাকা ট্রিবিউন সংবাদ মাধ্যম থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠিত সংবাদ সংস্থা থেকে যখন এধরনের উদবেগজনক খবর পাওয়া যায়, খুব স্বভাবতই জনসাধারণের মনে শস্তির বাতাস বয় না।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই অপরাধ কর্মকান্ড গুলো ঘটির হওয়ার পেছনে কারন কী? এবং এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় কী?

কোনো কিশোর যখন অপরাধ কর্মকান্ডের সাথে জোড়িত হয় তখন আইন এর ভাষায় তাকে ক্রিমিনাল বলা যায় না, আইন তাদের কে স্পেসিফাই করে বলছে ‘জুভেনাইল ডেলিকেন্ট”।

বিশ্বের অনেক দেশের মত বাংলাদেশেও অনুর্ধ ১৮ বছর এর ছেলে মেয়ে দের কিশোর কিশোরী হিসাবে আখ্যায়ীত করা হয়। এই কিশোর রা যখন কোনো অপরাধের সাথে জোড়িত হয়ে পড়ে আইন তখন এই অপরাধ কে আউট অফ কিউরিওসিটি থেকে সংঘটির হয়েছে বলে ধরে নেয় এবং সাধারণত তেমন কোনো শাস্তি প্রদান করা হয় না বা সামান্য জরিমানা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয় খুব কম সংখ্যক মামলায় দেখা যায় তাদের সংশোধনাগারে প্রেরণ করা হয়।

তবে বাংলাদেশে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যায়, দিন দিন বাংলাদেশে কিশোর অপরাধ বেড়েই চলেছে তবে এর পিছনে যেই গুরুদায়িত্ব বা বড় কারণ কাজ করছে আমার মতে তার মধ্যে অন্যতম হলো আমাদের আইন এবং শান্তিদান পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা ও অনিয়ম। বিশ্বের উন্নত দেশসমূহে যেমনঃ নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইজ্বারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, কানাডা ইত্যাদি দেশে কারাগার ব্যবস্থা কিশোর দের ক্ষেত্রে প্রায় তুলে নেয়া হচ্ছে এবং রিহ্যাবিলিটেশন, কমিউনিটি এনগেজমেন্ট সম্পৃক্ত কার্যক্রম এর দিকে অগ্রসর হচ্ছে দেশ গুলোর সরকার। তবে আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে কারাগার স্থাপন করার প্রবণতা বেশি হচ্ছে দিন দিন। দেশে জুভেনাইল ডেলিকেন্ট বা কিশোর অপরাধী দের সংশোধনাগার এ প্রেরন তো

করা হচ্ছে তবে সেখানে তাদের কে সংশোধন করা নিয়ে তেমন উল্লেখযোগ্য কোন পদ্ধতি নেই। তারা দিনের পর দিন অন্যান্য কিশোর দের সাথে থাকছে মিশছে এবং অপরাধ কমার তুলনায় অপরাধের নতুন নতুন দিক সম্পর্কে অবগত হচ্ছে অপর দিকে বিশ্বের উন্নত দেশসমূহে দেখা যাচ্ছে কোনো কিশোর অপরাধের সাথে যুক্ত হলে তাকে রেয়ারলী কোনো সংশোধনাগারে পাঠানো হচ্ছে বরং বেশির ভাগ কেস এ দেখা যায় তাদের কে কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট এর সাথে সংশ্লিষ্ট কাজের সাথে যুক্ত করে দেয়া হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে তাকে চ্যারিটি অরগানাইজেশনে যুক্ত করে দেয়া হচ্ছে যাতে করে সে অপরাধ করার তেমন অবসর সময় পাচ্ছে না বা ইতিবাচক মানসিক পরিবর্তন সাধিত হয়ে যাচ্ছে বা মন পরিবর্তীত হয়ে অনেক সমাজ উন্নয়ন মূলক কাজে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। তবে যদি আমাদের দেশের আইন এবং কারেকশন পদ্ধতির সাথে মিলিয়ে দেখা যায় আমাদের দেশেও এই ধরনের কাজ করা হচ্ছে তবে খুবই কম ক্ষেত্রে এমন টা দেখা গেছে। খুব সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গিয়েছে একটি এলাকায় চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে চোর কে ১০০ দিনের মসজিদ পরিষ্কারের দায়িত্ব দিয়েছে সমাজের তরুণ রা। তবে ২০২৬ সালে এসে আমরা সমাজের দিকে তাকালে দেখতে পাই একজন কিশোর অপরাধী কারাবরণের পর ফিরে এসে আবরো একই অথবা ভিন্য অপরাধে জোড়িত হচ্ছে আইন অথবা ক্রিমিনাল ঘিওরির ভাষায় এই অভ্যাস বা প্রবণতা কে র‍্যাসিডিভিসম হিসেবে আক্ষ্যায়িত করা হয়েছে অর্থাৎ একজন ব্যক্তি একাধিকবার অপরাধ করলে এই ঘটনাকে অপরাধ প্রবনতা বা রেসিডিভিসম হিসেবে ধরা হয়। অপরাধ প্রবণতা কমানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে পরিবার বা পরিবার সম্পৃক্ততা, হিউম্যান সাইকোলোজি বলে কোনো ব্যক্তির মানসিক পরিবর্তনে মুখ্য ভূমিকা রাখে তার পরিবার তাই পরিবার হওয়া উচিৎ উদার মানসিকতার, কিশোর রা স্বভাবতই আবেগ অনুভুতি অথবা ভুল বশোতো অপরাধের সাথে প্রথমত যুক্ত হয় এক্ষেত্রে তার পরিবারের উচিত তার মানসিক পরিবর্তনে সহায়তা করা যদি তারা সেই প্রক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞ্যাত না হয় তবে তাদের উচিত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া, তবে আমাদের সমাজে এর উলটো ঘটনা লক্ষ করা যায়। খুব সাম্প্রতিক সময়ে একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গিয়েছে, যেখানে দেখা যায় জেল বা পুলিশি শান্তিদান কেমন এবং অপরাধ করলে কেমন অনুভূতি হয় সেটা প্রত্যক্ষ করার জন্য একদল ১৪-১৬ বছর বয়সী কিশোর তাদের বন্ধু মহলের একজন কে মর্মান্তিক ভাবে হত্যা করে তারা। শুরু দিকের কিশোর অপরাধ গুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় আমাদের দেশের শান্তিদান পদ্ধতি অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। যখন কোনো কিশোর প্রথম কোনো অপরাধের সাথে যুক্ত হয় তখন আইন তাদের অপরাধ ঘটনা কে আউট অফ কিউরিওসিটি বা ইন্টারেস্ট থেকে সংঘঠিত হয়েছে বলে ধরে নেয় তবে যখন অকে সংশোধনের উদ্দেশ্যে সামাজিক উন্নয়ন মূলক কর্মকান্ডে উৎসাহিত না করে গতানুগতিক সংশোধনাগারে পাঠানো হয় তখন সেখানে গিয়ে তার মানষিক পরিবর্তন ইতিবাচক না হয়ে নেতিবাচক হয় বলে দেখা গিয়েছে অনেক ক্ষেত্রে, সংশোধনাগারে গিয়ে নতুন নতুন অপরাধ কর্মকান্ড এবং তার কলাকৌশল রপ্ত করে তার আশে পাশের অন্যান্য কিশোর অপরাধী দের কাছ থেকে। এর একটি বড় কারণ হিসেবে চিনহিত করা যায় আমাদের সমাজের দৃষ্টি ভঙ্গি এবং জুভেনাইল দের প্রতি বিরুপ ব্যবহার।

এর সমাধান হিসেবে আমাদের সমাজকে সচেতন করতে হবে ও শান্তি ভোগকৃত কিশোর কে শিক্ষার দিকে ফিরিয়ে আনতে উদার মানসিকতার পরিচয় দিতে হবে এবং গতানুগতিক কারেকশন মেথড অর্থাৎ ক্রাইম কন্ট্রল মডেল থেকে বের হয়ে এসে আমাদের আইন এবং কারেকশন সিস্টেম এর উচিত ডিউ প্রসেস মডেল অনুশরন করা। যেখানে জেল হাযতের চেয়ে মানসিক ইতিবাচক পরিবর্তন কে বেশি স্বীকৃতি দেয়া হয়। অর্থাৎ, কোনো কিশোর যখন প্রথম অপরাধ করে তখন তাকে আইনের আওতায় আনা হলেও আইন গতানুগতিক ধারার বাইরে এসে তাকে তার মানসিক স্থিতি পরিবর্তনের সুযোগ দেয়া যেতে পারে একই সাথে তাকে তার নৈতিক মূল্যবোধ উজ্জিবিত করতে আইন সহায়তা করতে পারে। এসম্পরকে এডউইন হার্ডিন সাদারল্যান্ড তার একটি জনপ্রিয় থিওরি ডিফারেনশিয়াল অ্যাসোসিয়েশন থিওরি তে বলেন ক্রিমিনাল বিহেভিওর ইজ লার্ল্ড এর মানে হলো অপরাধ কেও মাতৃগর্ভ থেকে ধারণ করে আসে না এটি সমাজ থেকে গৃহীত। সমাজ বিসারদ দের দৃষ্টিতে বলা যায়, যদি অপরাধ সমাজ থেকে ধারণ করা হয়েই থাকে তাহলে অপরাধের প্রবণতা বা শেকড় সমাজ থেকেই নির্মূল করা যেতে পারে। পুলিশের উচিত রিয়াক্টিভ প্রসেস উন্নত করে অপরাধিদের মানসিক পরিবর্তনের ধারায় ফিরিয়ে আনা এবং অপরাধ প্রবনতা কমানোর জন্য প্রো-এক্টিভ মেথড ফলো করা এতে তারা সমাজের ইতিবাচক উন্নতি করতে উৎসাহ প্রদান করতে পারে এবং প্রিভেন্টিভ মেজার হিসেবে তারা কিশোর দের সামাজিক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হতে সাহায্য করতে পারে যাতে করে একজন কিশর অপরাধ করার সময় বা সুজোগ এবং ওই ধরণের মানসিক পরিস্থিতির মধ্যে না আসতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, অপরাধ সমাজ থেকে বাড়লে সমাজ থেকেই কমানো সম্ভব যদি সমাজ চায়। সমাজের উচিত অপরাধীকে ঘৃণা না করে অপরাধ কে নির্মূল করার দিকে নজর দেয়া যাতে করে কোনো কিশোর কিশোরী অপরাধের দিকে যেতেই না পারে, পরিবারের উচিত তাদের সদস্য তথা সন্তান দের দিকে খেয়াল রাখা, অপ্রত্যাশিত ভাবে যদি সন্তান অপরাধে জড়িয়ে পড়ে তাহলে তাকে সমাজের মানুষ কি বলবে বা কি করবে সে কথা ভাবার চেয়ে তাদের সন্তান কে মানসিক সহায়তা করা এবং তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় কার্যক্রমে উদবুধ্য করা কারণ সকল ধর্ম শান্তির কথা বলে। তাই নৈতিক মূল্যবোধ জাগাতে ধর্মীয় কার্যক্রম বড় ভূমিকা রাখে। সমাজের সকলের উচিত কেও অপরাধ করলে তাকে সমাজে হেয় না করে সম্মানের সাথে শিক্ষায় সহায়তা করা এবং নতুন করে সমাজে সম্মানের সাথে বাচতে সাহায্য করা।

জাকির হোসেন
শিক্ষার্থী
ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *