কিশোর গ্যাং: কৈশোরের হাতে বইয়ের সুবাস নয়, কেন অস্ত্রের নির্মম স্পর্শ?
কৈশোরকাল শুধু বেড়ে ওঠার একটি ধাপ নয়,এটি একজন মানুষের ভবিষ্যত জীবনের বুনিয়াদ। শৈশব থেকে পূর্ণ বয়সে পরিণত হওয়ার মধ্যবর্তী সময়কালকে বলা হয় কৈশোরকাল। এটি এমন একটি পর্যায়, যখন একজন মানুষের শারীরিক, মানসিক,আবেগীয়, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ দ্রুত ঘটে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মতে, ১০-১৯ বছর বয়সকে কৈশোরকাল বলা হয়। গ্যাং হলো এমন একটি সংগঠিত দল বা গোষ্ঠী, যেখানে কিছু ব্যক্তি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা পরিচয়ের ভিত্তিতে একত্রিত হয়। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে এই দলকে অপরাধী গ্যাং বলা হয়। আর কিশোর গ্যাং হলো এমন একটি সংঘবদ্ধ দল, যেখানে কিশোররা বন্ধুত্ব, প্রভাব বিস্তার বা পরিচিতি লাভের উদ্দেশ্যে একত্রিত হয়ে অনেক সময় নেতিবাচক ও অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে। কৈশোরের আবেগপ্রবণ মন, অপরিণত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং ভুল দিকনির্দেশনার প্রভাব অনেক সময় এসব দলকে সহিংসতা, ইভটিজিং,মাদক, চাঁদাবাজি ও নানা ধরনের সামাজিক অপরাধের অন্ধকার পথে ঠেলে দেয়। কিশোররা কি জন্মগতভাবে অপরাধী,নাকি পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ তাদের ভুল পথে ঠেলে দিচ্ছে?
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে একটি উদ্বেগজনক সামাজিক সমস্যা ও আতঙ্কের নাম হলো কিশোর গ্যাং। কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি বর্তমানে তরুণদের মাঝে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। যে বয়সে একজন কিশোরের হাতে থাকার কথা বই,কলম, সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে তারা কিশোর গ্যাং এর মতো একটি সামাজিক ব্যাধির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে আমাদের নতুন প্রজন্ম ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। প্রথম দিকে কিশোর গ্যাং কালচার রাজধানী এবং বড় বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে তা সারাদেশে ভয়াবহভাবে বাড়ছে। কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি প্রথমে আড্ডা, ইভটিজিংয়ের মধ্যে গণ্ডিবদ্ধ থাকলেও তা এখন দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, মাদকব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার, এমনকি খুনখারাবি পর্যন্ত গড়িয়েছে। এর ফলে সমাজে নিরীহ মানুষ যাদের সমাজে কোনো প্রভাব নেই কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে সম্পর্ক নেই, তারা প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে। তাদের প্রতিটি দিন কাটে অনিশ্চয়তা ও ভয়ের ছোঁয়ায়- কখন চাঁদাবাজরা এসে হুমকি দেবে,আর কখন তাদের নিজস্ব জায়গা-জমি জবরদখলের শিকার হবে সেই শঙ্কায়। ফলে সমাজে অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হয়। হিরোইজম, কাঁচা টাকা-পয়সা, মাদকাসক্তি সাংস্কৃতিক চর্চার নামে সস্তা ছেলে মেয়েদের অবাধে মেলামেশার তীব্র আকর্ষণ ইত্যাদি কারণে কিশোর গ্যাং এবং তাদের সদস্য সংখ্যা বাড়ছে। এসব কিশোর গ্যাং জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক অন্ধকার সুড়ঙ্গের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাছাড়া আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে এবং সামাজিক স্থবিরতা বিনষ্ট হয়।

কিশোর গ্যাং কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং বহুমাত্রিক কারণের ধারাবাহিক প্রভাবে গড়ে ওঠা একটি জটিল সামাজিক সমস্যা। পারিবারিক অবহেলা, সামাজিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবসহ নানাবিধ কারণে এর বিস্তার ঘটছে। পরিবার একটি শিশুর প্রাথমিক বিদ্যালয়। পিতা-মাতা অনেক সময় সন্তানদের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ ও সময় দিতে পারে না। ফলে তারা কোনো বিপথগামী বন্ধু কিংবা অপরাধচক্রের সাথে জড়িয়ে পড়ে। কৈশোরে বন্ধুত্বের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। এ কারণে বন্ধুমহলের নেতিবাচক প্রভাব এবং তাদের জীবনধারার প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ অনেক কিশোরকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে। গ্যাংয়ে যোগ দেওয়াকে তারা বাহাদুরি এবং আধিপত্যের প্রতীক ভাবতে শুরু করে। নৈতিকতা,সততা, সহমর্মিতা, সহিষ্ণুতা, দায়িত্ববোধের মতো সামাজিক মূল্যবোধের অভাব একজন কিশোরকে সহজেই অপরাধের দিকে ধাবিত করতে পারে। মাদকের সংস্পর্শে এলে একজন কিশোরের বিচার বিবেচনা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং নৈতিক বোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত চক্র কিশোরদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে এবং কিশোরদের গ্যাংয়ের অন্তর্ভুক্ত করে। তাছাড়া যে পরিবেশে সহিংসতা, অস্ত্রের প্রদর্শন বা অপরাধ স্বাভাবিক, সেখানে বেড়ে ওঠা কিশোররাও এসব আচরণ অনুকরণ করতে শুরু করে। যখন কোনো কিশোর বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ে, তখন তার অবসর সময় বেড়ে যায়। এতে করে সে সহজেই নেতিবাচক সঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট হয়। দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক বৈষম্য কেবল আর্থিক সংকটই সৃষ্টি করে না, বরং কিশোরদের দ্রুত উপার্জনের আশায় অপরাধজগতে ঠেলে দেয়। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সহিংসতা, অস্ত্রের প্রদর্শন, অপরাধমূলক কার্যক্রম এবং গ্যাং কালচারকে আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপন করা হলে অনেক কিশোর তা দেখে প্রভাবিত হতে পারে। অনেক সময় অপরাধমূলক কাজের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে ছোটোখাটো অপরাধও একসময় প্রকট আকার ধারণ করে।

শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিশোর গ্যাংয়ের মতো সামাজিক সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না। কারণ শাস্তি কখনোই কোনো সমস্যাকে পুরোপুরি নির্মূল করতে পারে না।এর জন্য শাস্তির পাশাপাশি প্রতিরোধও প্রয়োজন। আর এই সমস্যার সমাধানের জন্য পরিবার,সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। অভিভাবকদের সন্তানদের প্রতি যত্নশীল হতে হবে।এর পাশাপাশি তারা কাদের সাথে মেলামেশা করছে, কোথায় যাচ্ছে- এ বিষয়ে সচেতন দৃষ্টি রাখতে হবে। সুস্থ,মানবিক ও দায়িত্বশীল প্রজন্ম গড়ে তুলতে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বীজ শৈশবেই রোপণ করতে হবে,কারণ এই সময়েই একজন মানুষের চরিত্র,বিবেক ও মানবিকতার দৃঢ় ভিত্তি গড়ে ওঠে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যথাযথ কাউন্সেলিং এবং খেলাধুলার ব্যবস্থা করতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে জনগণকে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অপরাধের বিরুদ্ধে যথাসময়ে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে নজির সৃষ্টি করতে হবে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে কিশোর গ্যাং প্রতিরোধের প্রকৃত সাফল্য অপরাধ দমনে নয়, বরং পথভ্রষ্ট কিশোরদের পুনরায় সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা।
