খাদ্যের আড়ালে অখাদ্য: স্বাস্থ্যঝুঁকিতে সাধারণ ভোক্তা

Spread the love

খাদ্যের আড়ালে অখাদ্য: স্বাস্থ্যঝুঁকিতে সাধারণ ভোক্তা

অতিরিক্ত মুনাফার লোভে মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে অসাধুচক্র; প্রতিনিয়ত জরিমানা ও অভিযান হলেও পুরোপুরি থামছে না অখাদ্যের মহোৎসব।

খাদ্য আমাদের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান উপাদান। খাবার থেকেই আমরা পুষ্টি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও কাজ করার শক্তি পাই। অথচ সেই খাদ্যেই এখন মিশছে ক্ষতিকর রাসায়নিক। শিশুখাদ্য থেকে শুরু করে চাল, ডাল, মসলা, প্রায় সব খাদ্যপণ্যেই মুনাফালোভী কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অননুমোদিত ও বিষাক্ত রাসায়নিক মেশাচ্ছেন। ফলে পুষ্টির বদলে সাধারণ ভোক্তার শরীরে ঢুকছে বিষ। দীর্ঘদিন এসব খাবার গ্রহণের ফলে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের সমস্যাসহ নানা জটিল রোগ হতে পারে।

• বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১,৭১৩টি খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা করে ৫৭১টিতে ভেজাল ও ক্ষতিকর উপাদান শনাক্ত করেছে।

• চলতি বছরের ৬-১২ সেপ্টেম্বর দেশের বিভিন্ন খাবারের দোকান, হোটেল এবং খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে ১৯টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ২৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

অসাধু খাদ্য ব্যবসায়ীদের কম খরচে দ্রুত মুনাফার লোভ গোটা মানবজাতির জন্য একটা মরণ ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যকে সুস্বাদু ও আকর্ষণীয় করতে খাবারে মেশানো হয় অননুমোদিত, মাত্রাতিরিক্ত কৃত্রিম রং, ভেজাল চিনি।

সবজি সতেজ ও সবুজ দেখাতে ফরমালিন, কপার সালফেট, ম্যালাকাইট গ্রিন নামক বিষাক্ত কেমিক্যাল প্রয়োগ করা হয়। পরিমাণ ও ওজন বাড়াতে চালের সাথে বালি, পাথরের গুঁড়ো। দইয়ে দেওয়া হয় টয়লেট টিস্যু।

হলুদ-মরিচে মেশানো হয় লেড ক্রোমেট, মেটালিন ইয়েলো, ইটের গুঁড়া।

এছাড়া বিভিন্ন ধরনের মসলা তৈরিতে দেওয়া হয় গাছের গুঁড়াসহ বিভিন্ন ভেজাল উপাদান।

আটা-ময়দার সাথে পটাশিয়াম ব্রোমেট (ক্যান্সার কোষ তৈরির জন্য দায়ী), চকির গুঁড়ো।

মুড়ির সাথে ইউরিয়া।

বেকারি, রেস্তোরাঁয় হোটেলে ব্যবহার করা হচ্ছে অপরিশোধিত চামড়ার লবণ, পোড়া তেল, কৃত্রিম চিনি।

অল্প দুধের সাথে সয়াবিন, সোডা, সোলবুল, পানি মিশিয়ে তৈরি হয় দুধ।

চিনির সিরাপের সাথে কেমিক্যাল মিশিয়ে মৌমাছি ছাড়াই তৈরি করা হচ্ছে মধু।

আইসক্রিম, আইস ললি সহ বিভিন্ন প্যাকেটজাত জুসের সাথে পাওয়া যাচ্ছে কৃত্রিম কাপড়ের রং, স্যাকারিন।

মাছ ও পোল্ট্রির খাদ্য তৈরিতে ব্যবহার করা হয় ট্যানারির বর্জ্য, ক্রোমিয়াম, অ্যান্টিবায়োটিক ও আর্সেনিক। এসব পোল্ট্রি ও মাছ গ্রহণে আমিষের পাশাপাশি শরীরে প্রবেশ করছে সীসা, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিকের মতো হেভি মেটাল।

সাম্প্রতিক অভিযোগ

● লক্ষ্মীপুরের বিসিক এলাকায় ‘তাহের ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ’কে ক্ষতিকর পরিবেশে ভেজাল ঘি ও মার্জারিন উৎপাদনের অভিযোগে জরিমানা করা হয়।

● যশোরের কেশবপুরে ভেজাল শিশুখাদ্য মজুত ও বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।

● রাঙ্গুনিয়ায় গাছের গুঁড়ি ও তুষের ভুসি দিয়ে মসলা তৈরির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

মাঠপর্যায়ের সমস্যা

ফসলের রোগবালাই দমনে কৃষকেরা যে কীটনাশক ব্যবহার করেন তার বিষক্রিয়া কাটতে প্রয়োগের পর নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে, কিংবা ভালো দামের আশায় অনেক কৃষক সেই সময় পার হওয়ার আগেই ফসল তুলে বাজারে পাঠান। ফলে রান্নার পরও শাকসবজিতে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থেকে যায়।

স্বাস্থ্যঝুঁকি

এসব রাসায়নিক ও ভেজালযুক্ত খাদ্যের কারণে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের ক্ষতি, পরিপাকতন্ত্রের রোগসহ নানা গুরুতর অসুখ হতে পারে। ভেজাল খাদ্য গোটা বিশ্বেরই একটি নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে প্রতি ৯ জনের ১ জন দূষিত খাদ্য খেয়ে অসুস্থ হন। প্রতি বছর প্রায় ৮৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হন এবং ১৫ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।

ডব্লিউএইচও-এর প্রতিবেদনে জানিয়েছে আফ্রিকার পরেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় খাদ্যবাহিত রোগের প্রকোপ বেশি।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ মানুষ ক্যান্সারে, ২ লাখ মানুষ কিডনি ও লিভারের সমস্যায় এবং ১.৫ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশের প্রায় ১৬ শতাংশ মানুষ কিডনি রোগে ভোগেন।

সমস্যার পেছনের কারণ

• জনসংখ্যার তুলনায় কৃষিজমি কম হওয়ায় খাদ্যে ঘাটতি দেখা দেয়।

• মৌসুমে উৎপাদিত বাড়তি ফসল সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত গুদাম ও হিমাগার নেই। পচন ঠেকাতে ও দীর্ঘদিন রাখতে তাই রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়।

• সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনেক সময় কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়।

• কম খরচে দ্রুত মুনাফার লোভ।

• পর্যাপ্ত নিরাপদ খাদ্য না পেয়ে ক্রেতারা অনেক সময় জেনে শুনেই ভেজাল খাবার কিনতে বাধ্য হন।

সরকারের পদক্ষেপ

• পারিবারিক পুষ্টি বাগান প্রকল্প: বাজারের অনিরাপদ ও রাসায়নিকযুক্ত ফসলের ওপর নির্ভরতা কমাতে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে এই প্রকল্প শুরু হয়। ৬৪ জেলার গ্রামীণ বসতবাড়ির পতিত জমিতে সম্পূর্ণ জৈব উপায়ে বিষমুক্ত শাকসবজি চাষের জন্য বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ, বীজ, সার ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

• ভ্রাম্যমাণ ল্যাব ভ্যান: ৬৪ জেলায় ভ্রাম্যমাণ ল্যাব ভ্যান চালু এবং তাৎক্ষণিক পরীক্ষার জন্য মোবাইল ল্যাবরেটরি ও বিএফএসএর সক্ষমতা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে।

• আইন ও প্রয়োগ: বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪; ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯; এবং নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-তে ভেজাল খাদ্য তৈরি, মজুত ও বিক্রির শাস্তির বিধান আছে। প্রচলিত বিধান অনুযায়ী অপরাধের ধরনভেদে সর্বনিম্ন ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা জরিমানা এবং ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে শাস্তি দ্বিগুণ হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঠপর্যায়ে এসব আইনের শতভাগ প্রয়োগ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় অসাধুচক্র পার পেয়ে যাচ্ছে।

সরকারের করণীয়

• পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন, আমদানি ও সংরক্ষণে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।

• খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অভিযান চালানো।

• শুধু সাময়িক তালাবন্ধ নয়, দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, লাইসেন্স বাতিল এবং মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা।

• প্রতিটি জেলায় আধুনিক ল্যাব স্থাপন ও বিশ্লেষক বাড়ানো।

• স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভেজাল খাদ্য সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা।

• কৃষকদের ফসল উৎপাদন ও কীটনাশক প্রয়োগে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং কীটনাশকের প্রাকৃতিক বিকল্প ব্যবহারে উৎসাহিত করা।

ভোক্তা হিসেবে আমাদের করণীয়

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সচিব আব্দুন নাসের খান বলেছেন, নিরাপদ খাদ্যের জন্য কেবল ভ্রাম্যমাণ আদালত সমাধান নয়; জনগণকেও সচেতন হতে হবে।

• বাইরের প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর নির্ভরতা কমানো।

• বাড়ির আঙিনা, ছাদ বা পরিত্যক্ত জায়গায় টবে শাকসবজি ও ফলমূল চাষ করা।

• বাজার থেকে আনা শাকসবজি ও ফলমূল ১৫-২০ মিনিট লবণ মেশানো পানিতে ভিজিয়ে ধুয়ে নেওয়া। এতে ফরমালিন ও কীটনাশকের প্রভাব কিছুটা কমে যায়।

• প্যাকেটজাত পণ্য কেনার সময় মেয়াদ ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেখে নেওয়া।

• অনিয়মের আভাস পেলে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং অভিযোগ জানানো।

নিরাপদ খাদ্য প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কিন্তু শুধু আইন বা অভিযানে এই সমস্যার সমাধান হবে না। সরকারি তদারকি, কঠোর আইন প্রয়োগ, কৃষকের সচেতনতা ও ভোক্তার সতর্কতা একসঙ্গে কাজ করলেই খাদ্যের আড়ালের এই অখাদ্য ঠেকানো সম্ভব।

ভেজাল খাদ্যের অভিযোগ জানান

জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (ডিএনসিআরপি)

• হটলাইন: ১৬১২১ (ভোক্তা-বার্তায়ন)

• অভিযোগ কেন্দ্রের মোবাইল: ০১৭৭৭-৭৫৩৬৬৮

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)

• হটলাইন: ১৬১৫৫

আমি আব্দুল্লাহ আল ফাহাদ
১ম বর্ষ (ক্রিমিনোলজি এন্ড পুলিশ সাইন্স)
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
খাদ্য ভেজালের উপর একটি আর্টিকেল লিখেছি ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *