এক বছরে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার কর ফাঁকি উন্মোচন, বিপাকে হাজারো ফাঁকিবাজ
দেশে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা কর ফাঁকির চিত্র অবশেষে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটের অনুসন্ধানে গত এক বছরে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার গোপন সম্পদ ও আয়ের হদিস মিলেছে। এই তালিকায় নাম উঠে এসেছে তিন হাজারেরও বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের, যাদের অনেকের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ সুবিধাভোগীদের নাম।
কীভাবে ধরা পড়ল এত বড় অঙ্কের ফাঁকি
কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তদন্তে দেখা গেছে অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ধরে প্রকৃত আয় ও সম্পদের তথ্য গোপন রেখেছে। এসব সম্পদের সিংহভাগ বিনিয়োগ হয়েছে জমি, ফ্ল্যাট ও গাড়ির মতো খাতে। এখন পর্যন্ত অনুসন্ধানে একটি একক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই প্রায় ১,২০০ কোটি টাকার কর ফাঁকির প্রমাণ মিলেছে, যা এই ধরনের ঘটনার মধ্যে অন্যতম বড়।
তদন্তের চাপ বাড়তে থাকায় ফাঁকিবাজদের মধ্যে নিজে থেকেই বকেয়া কর পরিশোধ করে দায় এড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গত এক বছরে ২১৩ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মোট ৩৮০ কোটি টাকা বকেয়া কর পরিশোধ করেছে, যাদের মধ্যে একজনই একাই পরিশোধ করেছেন ৫০ কোটি টাকা। তবে এখনো পর্যন্ত অভিযুক্তদের নাম প্রকাশ করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, কারণ তদন্ত এখনো চলমান।
কেন এত সহজে টিকে থাকে কর ফাঁকি
গবেষকদের মতে, দুর্বল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, তদারকির ঘাটতি ও অপ্রতুল ডিজিটাল অবকাঠামো— এই তিনটি কারণেই উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কর ফাঁকি এত দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকার সুযোগ পায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও চিত্রটি ভিন্ন নয়। দীর্ঘদিন রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়ায় থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক সহজেই ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, দুর্নীতি ও কর ফাঁকির চূড়ান্ত মাশুল শেষ পর্যন্ত গুনতে হয় সাধারণ মানুষকেই— উৎপাদন ও সেবার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে।
সামনের চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু পুরনো ফাঁকি উদ্ঘাটন করলেই চলবে না, দরকার টেকসই ও স্বচ্ছ কর ব্যবস্থাপনা। রাজস্ব ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে কর মেনে চলার সংস্কৃতিও গড়ে উঠবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাই অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও নিয়মিত তদারকিই কর ফাঁকি রোধের প্রকৃত সমাধান বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাদমান সামির
শিক্ষার্থী, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
