জনরোষের চাপে পড়ে একজন ফৌজদারি আইনজীবীর আসামির পক্ষে আইনি লড়াইয়ে অস্বীকৃতি জানানো কেন আইন ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর

Spread the love

জনরোষের চাপে পড়ে একজন ফৌজদারি আইনজীবীর আসামির পক্ষে আইনি লড়াইয়ে অস্বীকৃতি জানানো কেন আইন ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর

আমাদের দেশে সাধারণত কোনো আলোচিত অপরাধমূলক ঘটনা, বিশেষ করে যৌন সহিংসতা বা হত্যাকাণ্ডের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে একটি নির্দিষ্ট ধারা পরিলক্ষিত হয়। বিপুলসংখ্যক মানুষ সুবিচারের দাবিতে সোচ্চার হন; এমনকি অনেকে আসামির ফাঁসি বা প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানান। যখন তারা জানতে পারেন যে একজন আইনজীবী আসামির পক্ষে মামলা পরিচালনা করছেন, তখন জনক্ষোভের নিশানা সেই আইনজীবীর দিকেও ঘুরে যায়। অনেকেই ধরে নেন যে আসামিপক্ষের আইনজীবী হয়তো নীতিহীন কিংবা শুধুই টাকার লোভে এই কাজ করছেন। তবে বাস্তবে এই ধারণা সত্য নয়। সাম্প্রতিক আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় অভিযুক্ত হিটুশেখের আইনজীবীর বিরুদ্ধেও ব্যাপক জনরোষ দেখা গেছে। এমনকি অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনগত সহায়তা পাওয়ার অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ মানুষ!

তবে জনমত কিংবা সংবাদমাধ্যমের চাপে পড়ে একজন আইনজীবীর এ ধরনের মামলা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানো উচিত নয়। কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:

সংবিধানের ৩৩(১) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত কোনো ব্যক্তিকে তার পছন্দনীয় আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করার এবং তার মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। এই মৌলিক সুরক্ষার মূল ভিত্তি হলো বাংলাদেশের ‘অ্যাডভার্সারিয়াল’ বা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বিচারব্যবস্থা, যেখানে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তকে নির্দোষ বলেই গণ্য করা হয়। এই নীতিকে আরও সুদৃঢ় করে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল প্রণীত পেশাগত আচরণবিধি (ক্যাননস অব প্রফেশনাল কনডাক্ট অ্যান্ড এটিকেট), যেখানে বলা হয়েছে—‘অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে আইনি লড়াই চালানো একজন আইনজীবীর অধিকার; এক্ষেত্রে আসামির অপরাধী হওয়ার বিষয়ে তার ব্যক্তিগত মতামত কোনো বাধা নয়… এবং একবার কোনো মামলার দায়িত্ব নিলে দেশের আইন অনুযায়ী সম্ভাব্য সকল ন্যায়সঙ্গত ও সম্মানজনক উপায়ে আসামির পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করতে আইনজীবী বাধ্য।’

ফলে আসামির নির্দোষ বা দোষী হওয়া সম্পর্কে আইনজীবীর ব্যক্তিগত ধারণা আইনের দৃষ্টিতে অহেতুক, কারণ উপযুক্ত আদালত সুষ্ঠু বিচারপ্রক্রিয়া শেষে দোষী সাব্যস্ত করার পরই কেবল একজন মানুষকে আইনগতভাবে অপরাধী বলা যায়। বাস্তবে বিচারকের কাছে আইনজীবীর দায়িত্ব আদালতকে প্রতারিত করা নয়; বরং রাষ্ট্রপক্ষ যাতে সর্বোচ্চ আইনগত মানদণ্ড বজায় রেখে অপরাধ প্রমাণ করে এবং আসামির সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করে, তা নিশ্চিত করা। আসামির অধিকার রক্ষার পাশাপাশি প্রতিরক্ষাপক্ষের আইনজীবী আনুষ্ঠানিক আরজি জমা দেওয়া, নিয়মতান্ত্রিক আবেদন করা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার খুঁটিনাটি পরিচালনার মাধ্যমে বিচারককে কার্যতালিকাক্রম অনুযায়ী শুনানি সচল রাখতে সাহায্য করেন।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, বিচারব্যবস্থা যদি এমন বার্তা দেয় যে কোনো আসামি এতটাই অপরাধী যে তার আইনজীবী পাওয়ার অধিকারও নেই, তবে সাধারণ মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়াকেই সঠিক মনে করে এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে সময়ের অপচয় বলে ধরে নেয়। একজন আইনজীবী ছাড়া ভিত্তিহীন গুজব মোকাবিলা করা, তথ্য উপস্থাপন করা এবং প্রমাণের কঠোর মানদণ্ড দাবি করা অসম্ভব হয়ে পড়ে; ফলে পুরো বিষয়টি কেবল জনআবেগ, চাঞ্চল্যকর সংবাদমাধ্যম ও অনলাইন ক্ষোভের দ্বারা পরিচালিত হতে থাকে।

অতএব, তীব্র জনরোষের মুখে থাকা কোনো আসামি যখন একজন আইনজীবীর শরণাপন্ন হন, তখন আইনজীবীর উচিত নয় জনমতের কাছে নতি স্বীকার করা। বরং আইন অনুযায়ী মামলাটি গ্রহণ করে মক্কেলের পক্ষে আইনি লড়াই চালানোই তাঁর দায়িত্ব। তাঁর কখনোই আদালতকে বিভ্রান্ত করা উচিত নয় (যা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ) এবং বিচারপ্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় সহযোগিতা করা উচিত।

প্রকৃত ন্যায়বিচার শাস্তির দ্রুততা বা কঠোরতা দিয়ে মাপা যায় না, বরং যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত আসে তার নিরপেক্ষতার ওপর নির্ভর করে। আমাদের সমাজে আইনের শাসন টিকিয়ে রাখতে হলে শান্ত পরিস্থিতিতে যেমন, তীব্র জনরোষের মুহূর্তেও ঠিক একইভাবে তা প্রয়োগ করতে হবে। অপ্রিয় বা অভিযুক্তের পক্ষে আইনি লড়াই চালানো ন্যায়বিচারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা নয়; বরং এটিই সেই মূল ভিত্তি যার ওপর একটি সভ্য বিচারব্যবস্থা দাঁড়িয়ে থাকে।

সৌমিক পাল
ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *