কিশোর গ্যাং হলো মূলত কিশোর-কিশোরীদের (সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী) এমন একটি দল বা গোষ্ঠী, যা একত্রিত হয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। শহরাঞ্চল এবং বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার, হিরোইজম প্রদর্শন বা সস্তা বিনোদনের উদ্দেশ্যে এই দলগুলো গড়ে ওঠে।
কিশোর গ্যাং তৈরির প্রধান কারণসমূহ
পারিবারিক ও সামাজিক অবক্ষয়: পরিবারের ভাঙন, মা-বাবার মধ্যকার কলহ, সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া এবং নৈতিক শিক্ষার অভাব কিশোরদের বিপথগামী করে তোলে। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হলে কিশোররা বাইরের বন্ধুদের মধ্যে আশ্রয় খোঁজে।
রাজনৈতিক ও স্থানীয় বড় ভাইদের প্রভাব: পাড়া-মহল্লার কিছু স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক নেতা বা তথাকথিত “বড় ভাই” নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে কিশোরদের ব্যবহার করে। তারা কিশোরদের অস্ত্র, অর্থ ও আশ্রয় দেয়, যা তাদের বেপরোয়া করে তোলে।
মাদকাসক্তি ও অস্ত্রের সহজলভ্যতা: কৌতূহল বা বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে কিশোররা সহজেই মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে তারা ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধের সাথে যুক্ত হয়ে গ্যাং তৈরি করছে।
ইন্টারনেট ও অসুস্থ বিনোদন: স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের অপব্যবহারের ফলে কিশোররা বিভিন্ন মারামারি, গ্যাং কালচার ও অপরাধমূলক কনটেন্টের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। টিকটক বা লাইকির মতো প্ল্যাটফর্মে সস্তা জনপ্রিয়তার আশায় অনেকে দলবদ্ধ হয়ে অপরাধে লিপ্ত হয়।
অর্থনৈতিক সংকট ও হতাশা: দরিদ্র পরিবারের কিশোররা অনেক সময় মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে না পেরে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশায় ভুগে দ্রুত টাকা আয়ের জন্য গ্যাংয়ে যোগ দেয়।
মেঘনার চরে অস্ত্রের ঝনঝনানি: বাঁশগাড়ীতে ত্রাস সৃষ্টি করছে ‘কিশোর গ্যাং’
মাহফুজা সরকার সিনহা , নরসিংদী:
মেঘনা নদীবেষ্টিত নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চল বাঁশগাড়ী ইউনিয়ন এখন অপরাধের এক নতুন অভয়ারণ্য। চরের চিরাচরিত টেঁটাযুদ্ধ ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের পুরনো সংস্কৃতির সাথে এবার যুক্ত হয়েছে আধুনিক ‘কিশোর গ্যাং’ এর মারাত্মক থাবা। কিশোর অপরাধীদের বেপরোয়া তাণ্ডবে চরের সাধারণ মানুষের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, চরাঞ্চলের রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’ ও একশ্রেণীর প্রভাবশালী নেতার প্রত্যক্ষ মদদেই এই কিশোররা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আগে চরে লাঠিয়াল বা টেঁটাবিদদের কদর থাকলেও, এখন রাজনৈতিক মিছিল-মিটিংয়ে লোকবল দেখানো এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এই অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। বিনিময়ে এদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে মাদক ও ধারালো দেশীয় অস্ত্র, এমনকি মাঝেমধ্যে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়াও দিতে দেখা যায় এদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাঁশগাড়ী বাজারের এক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সন্ধ্যা নামলেই চরের অলিতে-গলিতে, বিশেষ করে স্কুল ও বাজারের মোড়ে মোড়ে এদের আড্ডা বসে। গ্রামের মা বোনরা বের হতে পারেন না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরাএলাকায় মাদক বিক্রি, ড্রেজার ব্যবসা ও চরের শান্ত পরিবেশ নষ্ট করতে জুয়া ও চাঁদাবাজির সিন্ডিকেটও নিয়ন্ত্রণ করছে।
বাঁশগাড়ীর সাধারণ মানুষের এখন একটাই দাবি—অনতিবিলম্বে চরাঞ্চলে বিশেষ অভিযান চালিয়ে এই কিশোর অপরাধী এবং তাদের নেপথ্যে থাকা গডফাদারদের আইনের আওতায় এনে চরের শান্তি ফিরিয়ে আনা হোক।
কিশোর অপরাধ যেনো না ঘটে সে বিষয়ে অভিভাবকদের তার সন্তানদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়ার আহ্বান রইল।
নাম: মাহফুজা সরকার সিনহা
শিক্ষার্থী: ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ(25-26), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (CU)।

