খাদ্যে ভেজাল : জনস্বাস্থ্যের নীরব হুমকি বাজারে প্রায় অর্ধেক খাদ্যপণ্যেই ভেজাল, বাড়ছে ক্যান্সার-কিডনি রোগের ঝুঁকি।

Spread the love

খাদ্যে ভেজাল : জনস্বাস্থ্যের নীরব হুমকি বাজারে প্রায় অর্ধেক খাদ্যপণ্যেই ভেজাল, বাড়ছে ক্যান্সার-কিডনি রোগের ঝুঁকি।

দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যেই এখন ভেজালের ছোবলে। দুধ, মাছ, মাংস, ফলমূল, শাকসবজি থেকে শুরু করে মশলা ও ভোজ্যতেলে পর্যন্ত কোনো পণ্যই নিরাপদ নয় । বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুসারে, বাজারে থাকা খাদ্যের ৪০ থেকে ৫৪ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে ভেজালযুক্ত। এর ফলে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের রোগসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন চিকিৎসকরা।

খাদ্যে ভেজাল বলতে বোঝায় খাদ্যের স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট করে নিম্নমানের, ক্ষতিকর বা সস্তা পদার্থ মিশিয়ে বিক্রি করা। অসাধু ব্যবসায়ীরা মুনাফা বাড়াতে ফরমালিন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড, কৃত্রিম রং, ইটের গুঁড়া, সয়াবিন তেলসহ নানা রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করছেন।

সবচেয়ে বেশি ভেজাল পাওয়া যায় দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে। পানি মিশিয়ে তরল করা, ফরমালিন যোগ করা এবং কৃত্রিম রং ব্যবহার করে থাকে । মাছ ও মাংস তাজা রাখতে ফরমালিন স্প্রে করা হয়। কাঁচা ফল পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড এবং শাকসবজিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। মশলায় ইটের গুঁড়া বা রং এবং ভোজ্যতেলে সস্তা তেল মেশানোর ঘটনাও নিয়মিত ধরা পড়ছে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভেজাল খাদ্য দেশের ৩৩ শতাংশ মানুষের বিভিন্ন রোগ এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রায় ৪০ শতাংশ অসুস্থতার প্রধান কারণ। দীর্ঘমেয়াদি সেবনে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

এ অবস্থার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অসাধু ব্যবসায়ীদের মুনাফার লোভ, দুর্বল নজরদারি, ভোক্তাদের সচেতনতার অভাব এবং আইন প্রয়োগে শিথিলতা। যদিও ২০১৩ সালের নিরাপদ খাদ্য আইনের অধীনে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) গঠিত হয়েছে এবং বিএসটিআই মান নিয়ন্ত্রণের কাজ করছে, তবুও মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগ এখনো পর্যাপ্ত নয় । অপরাধ বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে ক্রমান্বয়ে এটি একটি গুরুতর সামাজিক অপরাধে রূপ নিচ্ছে।

সরকার ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করলেও তা সাময়িক সময়ের জন্য কাজ করে । এ সমস্যা নিরসনে কঠোর আইন প্রয়োগ, প্রতি জেলায় খাদ্য পরীক্ষাগার স্থাপন, নিয়মিত বাজার মনিটরিং এবং ভোক্তা সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

ভোক্তাদের উচিত —বিশ্বস্ত দোকান থেকে কেনাকাটা করা, বিএসটিআই মার্ক দেখে পণ্য কেনা, অস্বাভাবিকভাবে সস্তা বা অতিরিক্ত তাজা দেখানো পণ্য এড়িয়ে চলা এবং সন্দেহজনক পণ্য দেখলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো।

খাদ্যে ভেজাল শুধু অর্থনৈতিক প্রতারণা নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ। নিরাপদ খাদ্য প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সরকার, প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এ নীরব হুমকি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

কানিজ ফাতেমা কাশফি
শিক্ষাবর্ষ : প্রথম বর্ষ
অপরাধবিজ্ঞান বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *