আরাফার ময়দানে বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণ; নাযিল হয় — সূরা আল-মায়িদা’র ৫:৩ আয়াত;

Spread the love

আরাফার ময়দানে বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণ; নাযিল হয় — সূরা আল-মায়িদা’র ৫:৩ আয়াত;
«الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا»
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।”

জন্ম ও শৈশব

হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্তমান সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে কুরাইশ গোত্রের বনি হাশিম বংশে জন্মগ্রহণ করেন। প্রচলিত মতে, তিনি ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে, ১২ রবিউল আউয়াল, সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আবদুল্লাহ এবং মাতার নাম আমিনা।

তিনি জন্মের পূর্বেই পিতাকে হারান। ছয় বছর বয়সে মা আমিনার ইন্তেকাল হয় এবং আট বছর বয়সে দাদা আবদুল মুত্তালিবও মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তাঁর লালন-পালনের দায়িত্ব নেন চাচা আবু তালিব।

নামকরণ

হযরত মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণের সংবাদ পেয়ে তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব তাঁকে কোলে নিয়ে কাবাঘরে যান এবং আল্লাহর প্রশংসা ও দোয়া করেন। এরপর তাঁর নাম রাখেন ‘মুহাম্মদ’, যার অর্থ ‘অধিক প্রশংসিত’।

‘আহমদ’ নামটিও ইসলামী ঐতিহ্যে তাঁর অন্যতম নাম হিসেবে পরিচিত। পবিত্র কোরআনে ‘মুহাম্মদ’ ও ‘আহমদ’ উভয় নামই উল্লেখ রয়েছে।

দুগ্ধপান ও শৈশব

প্রথমে তাঁর মা আমিনা তাঁকে দুধ পান করান। এরপর আবু লাহাবের দাসী সুওয়াইবা তাঁকে দুধ পান করান। পরে বনি সা‘দ গোত্রের হালিমা সাদিয়া (রা.) তাঁর দুধমা হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন।

হালিমা সাদিয়ার কাছে তিনি শৈশবের কয়েকটি বছর কাটান। সেখানে তাঁর দুধ ভাইদের সঙ্গে তিনি বড় হয়ে ওঠেন এবং গ্রামীণ পরিবেশে জীবনযাপন করেন।

দাদা ও চাচার তত্ত্বাবধানে

মা আমিনার মৃত্যুর পর দাদা আবদুল মুত্তালিব তাঁর দায়িত্ব নেন। তিনি নাতিকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। দাদার মৃত্যুর পর আট বছর বয়সে চাচা আবু তালিব তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

চাচার তত্ত্বাবধানে তিনি বেড়ে ওঠেন এবং পরবর্তীতে ব্যবসার কাজে তাঁর সঙ্গে শাম অঞ্চলে সফরও করেন।

খাদিজা (রা.)-এর সঙ্গে বিবাহ

২৫ বছর বয়সে হযরত মুহাম্মদ (সা.) খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.)-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। খাদিজা (রা.) ছিলেন সম্মানিত ও ব্যবসায়ী নারী। মুহাম্মদ (সা.)-এর সততা, বিশ্বস্ততা ও ব্যবসায়িক দক্ষতায় তিনি মুগ্ধ হন।

বিবাহের পর খাদিজা (রা.) দীর্ঘদিন তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহায়কদের একজন ছিলেন। নবুওয়াতের শুরুতেও তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সর্বপ্রথম সমর্থন করেন।

আল-আমীন উপাধি

নবুওয়াত লাভের আগেই মক্কার মানুষ তাঁর সত্যবাদিতা, আমানতদারি ও উত্তম চরিত্রের কারণে তাঁকে ‘আল-আমীন’ অর্থাৎ ‘বিশ্বস্ত’ নামে অভিহিত করত।

ওহি নাজিলের সূচনা

হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কার হেরা গুহায় নির্জনে ইবাদত ও চিন্তায় সময় কাটাতেন। ৪০ বছর বয়সে সেখানে ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) তাঁর কাছে আল্লাহর প্রথম ওহি নিয়ে আসেন।

প্রথম নাজিল হওয়া আয়াতগুলো হলো:

«اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ ۝ خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ ۝ اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ ۝ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ ۝ عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ»

“পড়ুন আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন ‘আলাক’ থেকে। পড়ুন, আর আপনার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত। যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না।”

— সূরা আল-আলাক, ৯৬:১–৫

দাওয়াতের নির্দেশ

আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে মানুষকে সতর্ক করার ও ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ দেন:

«يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ ۝ قُمْ فَأَنذِرْ ۝ وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ»

“হে চাদরাবৃত! ওঠো এবং সতর্ক করো। আর তোমার প্রতিপালকের মহিমা ঘোষণা করো।”

— সূরা আল-মুদ্দাসসির, ৭৪:১–৩

গোপনে ইসলামের দাওয়াত

নবুওয়াতের পর প্রথম পর্যায়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিকটজন ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে গোপনে ইসলামের দাওয়াত দেন।

সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন খাদিজা (রা.), আবু বকর (রা.), আলী ইবনে আবু তালিব (রা.) এবং যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.)।

প্রায় তিন বছর এভাবে সীমিত পরিসরে দাওয়াতের কাজ পরিচালিত হয়।

প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত

পরবর্তীতে আল্লাহর নির্দেশে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত শুরু করেন। তিনি সাফা পাহাড়ে কুরাইশদের সমবেত করে এক আল্লাহর ইবাদতের আহ্বান জানান।

এরপর থেকেই কুরাইশদের বিরোধিতা ও মুসলমানদের ওপর নির্যাতন আরও তীব্র হয়।

নির্যাতন ও ধৈর্য

মক্কার মুসলমানরা দীর্ঘদিন বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হন। বিলাল ইবনে রাবাহ (রা.), আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.)-সহ অনেক সাহাবি কঠিন নির্যাতন সহ্য করেন।

ইয়াসির (রা.) ও তাঁর স্ত্রী সুমাইয়া (রা.) ইসলামের প্রথম দিকের শহীদদের মধ্যে অন্যতম। এই কঠিন সময়েও রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিরা ধৈর্য ও দৃঢ়তা বজায় রাখেন।

তায়েফ গমন

চাচা আবু তালিব ও স্ত্রী খাদিজা (রা.)-এর মৃত্যুর পর রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠিন সময়ের মুখোমুখি হন। তিনি তায়েফে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং সেখানকার মানুষের কাছে সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।

কিন্তু তারা তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে এবং তাঁকে পাথর নিক্ষেপ করে আহত করে। এত কষ্টের পরও তিনি তাদের জন্য ধ্বংসের বদলে হেদায়াতের আশা প্রকাশ করেন।

মদিনায় হিজরত

মক্কার কুরাইশরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র করলে আল্লাহর নির্দেশে তিনি মদিনায় হিজরত করেন।

তিনি আবু বকর (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে সওর গুহায় আশ্রয় নেন এবং পরে মদিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এই হিজরত ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় সৃষ্টি করে এবং পরবর্তীতে ইসলামী হিজরি সনের ভিত্তি হয়।

মদিনায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা

মদিনায় পৌঁছে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথমে কুবায় মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর মদিনায় মসজিদে নববী নির্মাণ করেন।

তিনি মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন এবং একটি সুশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলেন।

মিরাজ

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মু‘জিযা হলো ইসরা ও মিরাজ।

কোরআনে ইসরার কথা উল্লেখ রয়েছে:

«“পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় নিয়ে গেলেন…”»

— সূরা আল-ইসরা, ১৭:১

এই সফরে তিনি মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় যান এবং সেখান থেকে ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ করেন। মিরাজের ঘটনায় পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের বিধান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

মক্কা বিজয়

হুদায়বিয়ার সন্ধি ভঙ্গ হওয়ার পর হিজরি অষ্টম বর্ষে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রায় ১০ হাজার সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে মক্কার দিকে অগ্রসর হন।

মক্কা বিজয়ের পর তিনি সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দেন এবং কাবা শরিফ থেকে মূর্তি অপসারণ করেন।

তিনি তিলাওয়াত করেন:

«وَقُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ ۚ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا»

“বলুন, সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।”

— সূরা আল-ইসরা, ১৭:৮১

বিদায় হজ

হিজরি দশম বছরে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজ পালন করেন। বিপুলসংখ্যক সাহাবি তাঁর সঙ্গে হজে অংশগ্রহণ করেন।

আরাফার ময়দানে তিনি ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। সেখানে মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের মর্যাদা, নারীদের অধিকার, মুসলিমদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব এবং আল্লাহভীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এ সময় কোরআনের আয়াত নাজিল হয়:

«الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا»

“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।”

— সূরা আল-মায়িদা, ৫:৩

ইন্তেকাল

বিদায় হজের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতা বেড়ে গেলে তিনি আয়েশা (রা.)-এর কক্ষে অবস্থান করেন।

অবশেষে হিজরি ১১ সালের রবিউল আউয়াল মাসে, ৬৩ বছর বয়সে, তিনি ইন্তেকাল করেন।

উপসংহার

হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ছিল তাওহিদ, ন্যায়, ধৈর্য, আমানতদারি, ক্ষমা, মানবিকতা ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের অনন্য দৃষ্টান্ত।

তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় মুসলমানদের জন্য শিক্ষা ও অনুসরণের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাঁর আদর্শ ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে ন্যায়, শান্তি ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার পথ দেখায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *