অভিনয় ছেড়ে ধর্মীয় জীবনে যেসব তারকা

Spread the love

অভিনয় ছেড়ে ধর্মীয় জীবনে যেসব তারকা

একসময় অভিনয়, মডেলিং ও বিনোদন জগতের আলোয় থাকা বেশ কয়েকজন তারকা পরবর্তী সময়ে স্বেচ্ছায় শোবিজ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। কেউ সংসার ও ধর্মীয় জীবনকে বেছে নিয়েছেন, কেউ আত্মোপলব্ধি থেকে অভিনয় ছেড়েছেন, আবার কেউ ইসলামি জীবনাদর্শ অনুসরণের সিদ্ধান্ত নিয়ে পুরোপুরি সরে দাঁড়িয়েছেন। এমন কয়েকজন তারকার কথা তুলে ধরা হলো—

শাবানা

১৯৯৬ সালে হঠাৎ করেই চলচ্চিত্র থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন ঢালিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী শাবানা। ষাটের দশকে চলচ্চিত্রে পা রাখা এই অভিনেত্রী দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমায় অভিনয় করেছেন।

অভিনয় ছাড়ার পর তিনি ধর্মীয় জীবনে মনোযোগী হন। নিয়মিত নামাজ, রোজা ও হজ পালনের পাশাপাশি নিজেকে অনেকটাই লোকচক্ষুর অন্তরালে নিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস শুরু করেন।

দেশে মাঝেমধ্যে এলেও জনসমক্ষে তাকে খুব একটা দেখা যায়নি। প্রায় এক বছর আগে ঢাকার একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হিজাব পরিহিত অবস্থায় তার ছবি ক্যামেরাবন্দি হলে আবারও আলোচনায় আসেন তিনি। তবে চলচ্চিত্রে ফেরার কোনো উদ্যোগ এখনো দেখা যায়নি।

সুচন্দা

ষাটের দশকে অভিনয়ে আসা কোহিনূর আক্তার সুচন্দা নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনা ও পরিচালনাতেও সাফল্য অর্জন করেন তিনি। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় সম্মানও।

নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রজগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন সুচন্দা। এরপর সংসার ও ধর্মীয় জীবনেই বেশি সময় দিতে শুরু করেন। নিয়মিত নামাজ, রোজা, হজ ও কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে তার দিন কাটছে বলে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

শাবনাজ-নাঈম

১৯৯৬ সালে ‘চাঁদনী’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে শাবনাজ ও নাঈমের। পর্দার জনপ্রিয় এই জুটি একসময় বাস্তব জীবনেও জুটি বাঁধেন। ভালোবাসার সম্পর্কের পর ২০০০ সালের শুরুর দিকে তারা বিয়ে করেন এবং ধীরে ধীরে অভিনয় থেকে নিজেদের সরিয়ে নেন।

এরপর সংসার ও ধর্মীয় জীবনেই মনোযোগী হন দুজন। বর্তমানে নাঈমকে দাড়ি এবং শাবনাজকে হিজাব পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। দীর্ঘদিন ধরেই তারা চলচ্চিত্রের বাইরে পারিবারিক ও ধর্মীয় জীবনযাপন করছেন।

সুজানা জাফর

জনপ্রিয় মডেল ও অভিনেত্রী সুজানা জাফরও একসময় শোবিজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেন। ২০০১ সালে মডেলিংয়ের মাধ্যমে বিনোদন জগতে যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি। পরবর্তীতে মডেলিং ও অভিনয়ে নিজের পরিচিতি তৈরি করেন।

ইসলামি জীবনাদর্শ অনুসরণের কারণে মিডিয়া থেকে দূরে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন সুজানা। পরিবারের সঙ্গে দুবাইয়ে অবস্থানকালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, কোরআন ও হাদিস অধ্যয়নের মাধ্যমে তিনি জীবনে নতুন এক ধরনের শান্তি খুঁজে পেয়েছেন।

ধর্মীয় পথে কাদের অনুসরণ করেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি মিজানুর রহমান আজহারীর ওয়াজ শোনার কথা জানান। দেশের বাইরের বক্তাদের মধ্যে ডা. জাকির নায়েক ও মুফতি ইসমাইলের আলোচনাও শোনেন বলে জানিয়েছিলেন তিনি।

অ্যানি খান

শিশুশিল্পী হিসেবে শোবিজে যাত্রা শুরু করেছিলেন অ্যানি খান। দীর্ঘ ২৩ বছরের ক্যারিয়ারের পর ধর্মীয় বিষয়ে নিজের আত্মোপলব্ধি থেকে বিনোদন জগত থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

অ্যানি খান জানিয়েছেন, কারও প্রভাবে নয়, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উপলব্ধি থেকেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মৃত্যুর পর নিজের কাজের হিসাব নিজেকেই দিতে হবে—এই উপলব্ধিই তাকে নতুনভাবে জীবন নিয়ে ভাবতে অনুপ্রাণিত করেছে বলে জানান তিনি।

সিমরিন লুবাবা

প্রয়াত মঞ্চ ও টেলিভিশন অভিনেতা আবদুল কাদেরের নাতনি সিমরিন লুবাবা। দাদার অনুপ্রেরণায় শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ে আসেন তিনি। বেশ কয়েকটি নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি বিজ্ঞাপন ও চলচ্চিত্রেও দেখা গেছে তাকে।

তবে সম্প্রতি নিজের জীবনধারায় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন লুবাবা। তার মা জাহিদা ইসলাম জেমি জানিয়েছেন, লুবাবার নিজের উপলব্ধি থেকেই এই সিদ্ধান্ত এসেছে। তিনি আর মিডিয়ায় কাজ করতে চান না, এমনকি জনসমক্ষে মুখও দেখাতে চান না। সে কারণে নেকাব পরা শুরু করেছেন তিনি।

জাহিদা ইসলাম জেমির ভাষ্য অনুযায়ী, ধর্মীয় বই, কোরআন ও হাদিস পড়তে পড়তেই লুবাবার মধ্যে এই পরিবর্তনের চিন্তা আসে। তিনি ইতোমধ্যে কোরআন খতম করেছেন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ পড়ছেন। এসব পড়াশোনার মাধ্যমে নিজের জীবনধারায় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

লুবাবার মা আরও জানিয়েছেন, আগামী রমজানে মক্কায় গিয়ে ওমরাহ পালনের পরিকল্পনাও রয়েছে তার। ভবিষ্যতে কোনো প্রচারণামূলক ভিডিওতে দেখা গেলেও লুবাবা মুখ দেখাবেন না; নিকাব পরিহিত অবস্থাতেই থাকবেন।

এর আগে লুবাবা নিজেও জানিয়েছিলেন, এখন মানুষের কাছে ইসলাম সম্পর্কে শিক্ষা দিতে তার ভালো লাগে এবং একই সঙ্গে তিনি নিজেও ইসলাম সম্পর্কে শিখছেন।

শিশুশিল্পী হিসেবে যে মেয়েটি একসময় অভিনয়ের মাধ্যমে পরিচিতি পেয়েছিল, সেই সিমরিন লুবাবাই এখন ধর্মীয় জীবন ও আত্মঅনুসন্ধানের দিকে বেশি মনোযোগী হয়েছেন।

নওবা তাহিয়া হোসাইন

তরুণ অভিনেত্রী ও মডেল নওবা তাহিয়া হোসাইনও শোবিজ অঙ্গন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। ২০২৬ সালের আগস্টে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি জানান, মিডিয়ায় চার বছরের পথচলার পর এই অধ্যায়ের ইতি টানছেন।

নওবা বলেন, এই সময়টি তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় একটি অধ্যায়। তবে বর্তমানে নিজের দ্বীন, আত্মঅনুসন্ধান ও শেখার প্রক্রিয়ার মধ্যেই তিনি প্রকৃত শান্তি খুঁজে পাচ্ছেন। পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত উন্নয়নকেও তিনি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন।

তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে নাটক, টিভিসি কিংবা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে তার নতুন কোনো কাজ আসবে না। অতীতে করা কিছু কাজ ভবিষ্যতে প্রকাশিত হলেও সেগুলোর সঙ্গে তিনি আর সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকবেন না।

দর্শক ও শুভানুধ্যায়ীদের ভালোবাসা ও সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে নিজের পোস্ট শেষ করেন নওবা।

নওবা তাহিয়ার মিডিয়ায় পথচলা শুরু হয় ছোটবেলায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের শিশুতোষ অনুষ্ঠান ‘কাননে কুসুম কলি’-এর উপস্থাপনার মাধ্যমে। পাশাপাশি তিনি আবৃত্তিচর্চার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে বড় হয়ে আবারও অনুষ্ঠানটির উপস্থাপনার দায়িত্ব পান।

তার সাবলীল উপস্থাপনা ও অভিনয় দক্ষতার কারণে বিটিভির সাপ্তাহিক নাটক ‘ফেরার গল্প’-এ বর্ষা চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। কাজী নূরুল হুদা জাহাঙ্গীরের রচনায় এবং সাহরিয়ার মোহাম্মদ হাসানের প্রযোজনায় নির্মিত নাটকটিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের প্রশংসা পান নওবা। এরপর নাটকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে কাজ করে অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের একটি অবস্থান তৈরি করেন তিনি।

শাহীন আলম

মঞ্চনাটকের মাধ্যমে অভিনয়জগতে যাত্রা শুরু করেছিলেন চিত্রনায়ক শাহীন আলম। ১৯৮৬ সালে এফডিসির ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ কর্মসূচির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। তার প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘মায়ের কান্না’, যা ১৯৯১ সালে মুক্তি পায়।

যদিও গোয়েন্দা কাহিনিনির্ভর ‘মাসুদ রানা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তার অভিনয়জগতে অভিষেক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অর্থসংকটে ছবিটির প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ হওয়ার পর তা বন্ধ হয়ে যায়। পরে ‘নয়া বাইদানি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পর শাহীন আলমকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

‘স্বপ্নের নায়ক’ চলচ্চিত্রে অমর নায়ক সালমান শাহর সঙ্গে অভিনয় করে বিশেষভাবে আলোচনায় আসেন এই অভিনেতা। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে দেড় শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে—‘ঘাটের মাঝি’, ‘এক পলকে’, ‘গরিবের সংসার’, ‘তেজী’, ‘চাঁদাবাজ’, ‘প্রেম প্রতিশোধ’, ‘টাইগার’, ‘রাগ-অনুরাগ’, ‘দাগী সন্তান’, ‘বাঘা-বাঘিনী’, ‘আলিফ লায়লা’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘আঞ্জুমান’, ‘অজানা শত্রু’, ‘দেশদ্রোহী’, ‘প্রেম দিওয়ানা’, ‘আমার মা’, ‘পাগলা বাবুল’, ‘শক্তির লড়াই’, ‘দলপতি’, ‘পাপী সন্তান’, ‘ঢাকাইয়া মাস্তান’, ‘বিগবস’ ও ‘বাবা ও বাঘের বাচ্চা’।

তবে জীবনের একপর্যায়ে রূপালি পর্দা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন শাহীন আলম। একটি ইউটিউব চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তিনি মুসলমান এবং পরকালে বিশ্বাসী। একদিন তাকে সৃষ্টিকর্তার কাছে ফিরে গিয়ে নিজের জীবনের হিসাব দিতে হবে—এই উপলব্ধি থেকেই তিনি পরকালের হিসাবকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। এসব বিষয় বিবেচনা করেই ধীরে ধীরে সিনেমা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার কথা জানান তিনি।

সিনেমাজগৎ থেকে সরে আসার পেছনে ধর্মীয় উপলব্ধির পাশাপাশি আরও কিছু কারণের কথাও জানিয়েছিলেন শাহীন আলম। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকাই ছবিতে যখন অশ্লীলতা ব্যাপক আকার ধারণ করে এবং চলচ্চিত্রের নিয়ন্ত্রণ নির্মাতাদের হাত থেকে প্রযোজকদের হাতে চলে যায়, তখন তিনি আর অভিনয় চালিয়ে যেতে পারছিলেন না।

তিনি জানান, তাকে অশ্লীল দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য চাপ দেওয়া হতো। তিনি রাজি না হলে পরবর্তীতে তার অজান্তে ‘কাটপিস’ জুড়ে দেওয়া হয়েছে—এমন ঘটনাও ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে তার বড় ভাই হজ পালন করে দেশে ফিরে তাকে চলচ্চিত্রজগৎ ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। পরে শাহীন আলম নিজেও উপলব্ধি করেন, আর কতদিন এভাবে চলা সম্ভব। এরপর সিনেমা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তবে রূপালি পর্দাকে বিদায় জানানোর পেছনে শাহীন আলমের ব্যক্তিজীবনের একটি মর্মান্তিক ঘটনাও গভীর প্রভাব ফেলেছিল। সেটি ছিল তার একমাত্র মেয়ের আত্মহত্যার ঘটনা।

এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল না করায় তার একমাত্র মেয়ে আত্মহত্যা করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ঘটনার পর শাহীন আলমের জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। তিনি নামাজের প্রতি আরও বেশি মনোযোগী হন এবং ধর্মীয় জীবনযাপনের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, পরকালের জবাবদিহির চিন্তা, চলচ্চিত্রের তৎকালীন পরিবেশ এবং ব্যক্তিগত শোক—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে রূপালি পর্দা থেকে সরিয়ে নেন শাহীন আলম। এরপর পারিবারিক ব্যবসা ও ধর্মীয় জীবনেই মনোযোগী হন এই অভিনেতা।

হাসান মাসুদ

একসময় নিয়মিত অভিনয় করলেও দীর্ঘদিন ধরে অভিনয় থেকে নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছেন অভিনেতা, পরিচালক ও লেখক হাসান মাসুদ। বর্তমানে বেছে বেছে বিজ্ঞাপনে কাজ করলেও নাটক কিংবা সিনেমায় তাকে আর নিয়মিত দেখা যায় না। সম্প্রতি সময় টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের বর্তমান জীবনযাপন ও অভিনয় থেকে দূরে থাকার কারণ নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।

হাসান মাসুদ জানান, জীবনে একটি পরিবর্তন আসার পর থেকেই নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছেন। ধর্মীয় ভাবনাও এখন তার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তার ভাষায়, তিনি এখন কিছুটা ভাববাদী ও ধার্মিক জীবনযাপনের দিকে ঝুঁকেছেন। অভিনয় থেকে দূরে থাকলেও ভালো বিজ্ঞাপনের কাজ পেলে মাঝে মাঝে তা করছেন।

নিজের সাম্প্রতিক ধর্মীয় জীবনের প্রসঙ্গ টেনে হাসান মাসুদ জানান, তিনি সম্প্রতি হজ পালন করেছেন। এ কারণে মক্কা ও মদিনায় প্রায় ৪১ দিন অবস্থান করেন। তবে তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই পরিবর্তন হঠাৎ করে আসেনি; আরও আগে থেকেই তার মধ্যে এই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল।

জীবনের এই পরিবর্তনের সঙ্গে তার বই পড়ার অভ্যাসেও বড় পরিবর্তন এসেছে। একসময় প্রচুর বই পড়লেও এখন আর বই পড়েন না তিনি। হাসান মাসুদের ভাষায়, অতিরিক্ত বই পড়তে পড়তে একসময় তিনি ‘যন্ত্রের মতো’ হয়ে গিয়েছিলেন। তার মধ্যে কোনো ভাবাবেগ বা অনুভূতি কাজ করত না।

নিজের সেই সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, কোনো দুর্ঘটনায় একজন মানুষের মৃত্যু হলেও তখন তার মনে স্বাভাবিক আবেগ তৈরি হতো না। বিষয়টিকে তিনি নিজের এক ধরনের অনুভূতিহীনতা হিসেবে দেখেছেন। এরপর নিজের সংগ্রহে থাকা প্রায় ১ হাজার ২০০ বই নীলক্ষেতে বিক্রি করে দেন। তার পর থেকেই আর বই পড়েন না বলে জানান তিনি।

হাসান মাসুদের কর্মজীবনের শুরু অবশ্য অভিনয় দিয়ে নয়। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন তিনি। সাত বছর পর, ১৯৯২ সালে ক্যাপ্টেন পদে অবসর নেন। এরপর সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন।

‘দ্য নিউ নেশন’-এ কাজ করার পর ১৯৯৫ সালে ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এ ক্রীড়া প্রতিবেদক হিসেবে যোগ দেন হাসান মাসুদ। পরে ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিবিসি বাংলার সংবাদদাতা হিসেবেও কাজ করেন তিনি।

সাংবাদিকতা থেকে অভিনয়ে আসেন হাসান মাসুদ। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘ব্যাচেলর’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ২০০৩ সালে বড়পর্দায় অভিষেক হয় তার। এরপর ‘মেড ইন বাংলাদেশ’সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। পাশাপাশি অসংখ্য নাটকে অভিনয় করে দর্শকের কাছে পরিচিতি পান।

‘হাউসফুল’, ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’, ‘এফডিসি’, ‘বউ’, ‘খুনসুটি’, ‘গ্র্যাজুয়েট’, ‘রঙের দুনিয়া’, ‘আমাদের সংসার’, ‘গণি সাহেবের শেষ কিছুদিন’ ও ‘বাতাসের ঘর’সহ বেশ কিছু নাটকে তার অভিনয় দর্শকের প্রশংসা পেয়েছে।

অভিনয়ের পাশাপাশি সংগীতেও যুক্ত ছিলেন হাসান মাসুদ। ‘ব্যাচেলর’ চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গান ‘আজকে না হয় ভালোবাসো’-তে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। ২০০৬ সালের ভালোবাসা দিবসে প্রকাশিত হয় তার প্রথম গানের অ্যালবাম ‘হৃদয়ঘটিত’।

অভিনয়, সাংবাদিকতা ও সংগীতের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বর্তমানে জীবনের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছেন হাসান মাসুদ। নিয়মিত অভিনয় থেকে দূরে থাকলেও বেছে বেছে বিজ্ঞাপনে কাজ করছেন। পাশাপাশি ধর্মীয় ভাবনা ও আত্মঅনুসন্ধানেই এখন বেশি মনোযোগী এই অভিনেতা।

তামিম মৃধা

তামিম মৃধার শোবিজ যাত্রার শুরুটা ছিল গান দিয়ে। এসএ টিভির ‘বাংলাদেশ আইডল’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনি ১৪তম অবস্থান অর্জন করেন। গান করার পাশাপাশি বিভিন্ন সময় মজার ভিডিও তৈরি করতেন। পরে নিয়মিত ইউটিউবে ভিডিও প্রকাশ করতে শুরু করেন।

এই ভিডিওগুলোই তার জন্য অভিনয়ের নতুন দরজা খুলে দেয়। ২০১৫ সালে ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে নির্মিত এয়ারটেলের টেলিছবি ‘মাংকি বিজনেস’-এ অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। রাহাত রহমান পরিচালিত ওই টেলিছবির মাধ্যমে তার অভিনয়জীবনের শুরু হয়।

এরপর নিয়মিত নাটকে অভিনয় করতে থাকেন তামিম মৃধা এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দর্শকদের কাছে পরিচিতি লাভ করেন।

ভিন্ন পথে, ভিন্ন সিদ্ধান্ত

শোবিজের ঝলমলে জগৎ থেকে সরে দাঁড়ানোর পেছনে প্রত্যেক তারকার কারণ এক নয়। কেউ সংসারকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, কেউ ধর্মীয় অনুশাসনে মনোযোগী হয়েছেন, আবার কেউ নিজের ব্যক্তিগত আত্মোপলব্ধি থেকে নতুন জীবনধারা বেছে নিয়েছেন।

তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে দর্শকদের মধ্যে নানা আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত এটি প্রত্যেকের ব্যক্তিগত জীবন ও বিশ্বাসের বিষয়। অভিনয় কিংবা বিনোদন জগতের বাইরে নিজেদের মতো করে জীবনযাপনের পথ বেছে নিয়েছেন তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *