
ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: ডিজিটাল অগ্রগতির আড়ালে লুকিয়ে থাকা সংকট ও সম্ভাবনা
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে আমরা দ্রুত এগিয়ে চলেছি। স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, টেলিভিশন, ফ্রিজ ও প্রযুক্তিনির্ভর এসব পণ্যের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। কিন্তু এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি নীরবে বাড়ছে আরেকটি বড় সমস্যা, ই-বর্জ্য বা ইলেকট্রনিক বর্জ্য (E-waste)। ব্যবহারের অযোগ্য বা পুরনো হয়ে যাওয়া বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিই মূলত ই-বর্জ্য। যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে এই বর্জ্য আজ পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে ই-বর্জ্যের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। প্রতি বছর লাখ লাখ মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্র বাতিল হয়ে যাচ্ছে। দুঃখজনকভাবে, এসব বর্জ্যের বড় অংশই অনিয়ন্ত্রিতভাবে ফেলা হয় বা অপরিকল্পিতভাবে রিসাইক্লিং করা হয়। ফলে এতে থাকা সীসা (Lead), পারদ (Mercury), ক্যাডমিয়াম (Cadmium) এবং অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ মাটি, পানি ও বায়ুতে ছড়িয়ে পড়ে। এসব উপাদান দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার, কিডনি রোগ, স্নায়বিক সমস্যা ও জন্মগত ত্রুটির মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
ই-বর্জ্য শুধু মানুষের জন্য নয়, প্রাণীজগতের জন্যও ভয়াবহ। নদী বা খালে ফেলা ইলেকট্রনিক বর্জ্য থেকে নির্গত বিষাক্ত রাসায়নিক পানির সাথে মিশে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর দেহে প্রবেশ করে। এতে খাদ্যচক্রের মাধ্যমে সেই বিষ আবার মানুষের শরীরে ফিরে আসে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাণীরা প্লাস্টিক বা ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক অংশ খেয়ে ফেলে, যা তাদের মৃত্যুর কারণ পর্যন্ত হতে পারে।
আমাদের দেশে ই-বর্জ্য সম্পর্কে সচেতনতা এখনো খুবই কম। অনেকেই পুরনো মোবাইল বা ব্যাটারি যত্রতত্র ফেলে দেন, যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। আবার কিছু ক্ষেত্রে অপ্রশিক্ষিত শ্রমিকরা খোলা জায়গায় ইলেকট্রনিক যন্ত্র পুড়িয়ে মূল্যবান ধাতু বের করার চেষ্টা করেন, যা মারাত্মক বায়ুদূষণ সৃষ্টি করে এবং তাদের স্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।
তবে সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ই-বর্জ্য হতে পারে অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি নতুন দিগন্ত। ই-বর্জ্যে রয়েছে সোনা, রূপা, তামা, অ্যালুমিনিয়ামের মতো মূল্যবান ধাতু। উন্নত দেশগুলো ইতোমধ্যে ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং শিল্প গড়ে তুলে বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করছে। বাংলাদেশেও আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা গেলে এই খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব, যা অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এই সমস্যার সমাধানে সরকার ও জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। ই-বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও রিসাইক্লিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা ও অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোকে “Extended Producer Responsibility (EPR)” নীতির আওতায় এনে তাদের পণ্যের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দিতে হবে।
অন্যদিকে, জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। আমাদের উচিত পুরনো ইলেকট্রনিক পণ্য নির্দিষ্ট সংগ্রহ কেন্দ্রে জমা দেওয়া এবং পুনঃব্যবহারযোগ্য পণ্য ব্যবহারে উৎসাহিত হওয়া। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুধুমাত্র একটি পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ নয়, বরং এটি একটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও বটে। সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর নীতি এবং সম্মিলিত সচেতনতার মাধ্যমে আমরা এই সংকটকে সুযোগে রূপান্তর করতে পারি। এখনই সময় দায়িত্বশীল আচরণ গড়ে তোলা এবং একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও টেকসই বাংলাদেশের জন্য ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।
মোঃ আবির আল হাসনাঈন
শিক্ষার্থী, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়





