সৌন্দর্যের লীলাভূমি চট্টগ্রামের অপরাধপ্রবণতা

Spread the love

সৌন্দর্যের লীলাভূমি চট্টগ্রামের অপরাধপ্রবণতা

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য লীলাভূমি চট্টগ্রাম। একদিকে পাহাড়, সমুদ্র, ঝর্ণা ও গিরিপথের অপরূপ সৌন্দর্য; অন্যদিকে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, ডাকাতি, চুরি, অপহরণ, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, মাদক ব্যবসা, সাইবার অপরাধসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের বিস্তার—এই দুই বিপরীত বাস্তবতা আজ চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলার চিত্রকে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অপরাধের ধরন যেমন বহুমাত্রিক হয়েছে, তেমনি অপরাধীদের কৌশলও হয়েছে আরও সংগঠিত ও আধুনিক।

পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরী ও সাত জেলায় ১০৯ জন অস্ত্রধারীর তালিকা রয়েছে। তবে তালিকার বাইরেও আরও প্রায় ১৩৯ জন অস্ত্রধারীর অস্তিত্বের তথ্য পাওয়া যায়। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই বিপুল সংখ্যক তালিকাভুক্ত ও তালিকার বাইরের সশস্ত্র অপরাধীদের কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কীভাবে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করবে?

চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ঘন বনাঞ্চল এবং দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে সহায়তা করে। অপরাধ গবেষক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতে, এই ভৌগোলিক সুবিধা অপরাধীরা আত্মগোপন, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক সংরক্ষণ এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ পরিচালনার জন্য ব্যবহার করে।

সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর, রাউজান, ফটিকছড়ি, কৈলাশহর ও রাঙ্গুনিয়ার বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। মহানগর বা জেলার বিভিন্ন স্থানে বড় ধরনের অপরাধ সংঘটনের পর অনেক অপরাধী এসব দুর্গম এলাকায় আত্মগোপন করে। অতীতে এসব এলাকায় অভিযান চালাতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনাও ঘটেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গল সলিমপুরে পুলিশের খাবার পানির ট্যাংকিতে বিষ প্রয়োগ এবং র‍্যাবের ঘাঁটিতে সশস্ত্র হামলার মতো ঘটনাও জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত শুধু চট্টগ্রাম জেলাতেই ২৯টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এছাড়া গত ছয় মাসে চট্টগ্রাম মহানগরের ১৬টি থানায় মোট ২৪৯টি চুরি ও ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে।এসব পরিসংখ্যান কেবল নথিভুক্ত ঘটনার প্রতিফলন; বাস্তবে অনেক অপরাধ অভিযোগ হিসেবেও নিবন্ধিত হয় না।

অতীতে থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি থেকে লুণ্ঠিত হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এসব অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র অপরাধীদের হাতে চলে যাওয়ায় সীতাকুণ্ড, মীরসরাই, রাউজানসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাং-ভিত্তিক সহিংসতা, রাজনৈতিক সংঘর্ষ এবং বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ বিভিন্ন নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে ধারণক্ষমতার প্রায় চারগুণ বন্দির চাপ সামলাতে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারকে অপরাধের ধরন ও অঞ্চলভিত্তিকভাবে চারটি অংশে ভাগ করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

সিএমপিতে বর্তমানে প্রায় ৬,৪৫৮ জন সদস্য কর্মরত রয়েছেন। তবে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পুলিশের সীমাবদ্ধতাও কম নয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— জনবল সংকট, আধুনিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা, যানবাহন ও লজিস্টিক সংকট, অপর্যাপ্ত বাজেট ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা, দ্রুত নগরায়ণ ও জনসংখ্যার চাপ, সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ, তদন্তে সময় ও কারিগরি সীমাবদ্ধতা, জনসচেতনতা ও জনসহযোগিতার অভাব, ভিআইপি ও বিশেষ নিরাপত্তা দায়িত্বের অতিরিক্ত চাপ এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ।

এমতাবস্থায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইপি ও সিসিটিভি ক্যামেরার বিস্তার, বিট পুলিশিং ও নিয়মিত টহল জোরদার, কিশোর গ্যাং দমন, মাদকবিরোধী অভিযান, পাহাড় ও উপকূলীয় অঞ্চলে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কমিউনিটি পুলিশিং আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, দ্রুত বিচার,বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেন ও বীরকন্যা প্রীতিলতার স্মৃতিবিজড়িত এই ঐতিহাসিক শহরকে নিরাপদ রাখতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে কেউ নয় ও অপরাধীরা যত বড় হোক না কেন তাদের মোকাবিলা করতে রাষ্ট্র সর্বদা প্রস্তুত এই বার্তা কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই অপরাধ দমনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও অপরাধমুক্ত চট্টগ্রাম গড়ে তোলা রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ নাগরিক—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।

নওশাদ আহমেদ নিলয়
শিক্ষার্থী,
প্রথম বর্ষ,ক্রিমিনোলজি এন্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ,চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *