পথ হারাচ্ছে কি কিশোর সমাজ?

Spread the love

পথ হারাচ্ছে কি কিশোর সমাজ?
চট্টগ্রাম শহরের একের পর এক এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়, বরং প্রতিনিয়ত সংবাদের শিরোনাম হয়ে উঠছে। যে বয়সে একজন কিশোরের হাতে থাকার কথা বই-খাতা কিংবা খেলার সরঞ্জাম, সেই বয়সেই আজ অনেকের হাতে উঠে আসছে অস্ত্র, আর তারা জড়িয়ে পড়ছে সংঘবদ্ধ সহিংসতা, চাঁদাবাজি এবং এলাকা দখলের লড়াইয়ে। এটি আর বিচ্ছিন্ন কোনো বখাটেপনা নয়—বরং একটি সংগঠিত অপরাধ কাঠামোর অংশ হয়ে উঠেছে, যেখানে কিশোররা নিজেরাই কখনো কখনো বৃহত্তর অপরাধ চক্রের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানাধীন মিয়াখান নগর এলাকায় গত এপ্রিলে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে যে গোলাগুলি ও সংঘর্ষ হয়, তাতে চারজন গুলিবিদ্ধ হন এবং মামলায় প্রধান আসামি করা হয় পুলিশের তালিকাভুক্ত এক শীর্ষ সন্ত্রাসীকে, যার সঙ্গে জড়িত ছিল একাধিক কিশোর গ্যাং সদস্য। এই ঘটনা স্পষ্ট করে দেয়, স্থানীয় প্রভাবশালী অপরাধীরা কীভাবে কিশোরদের ব্যবহার করে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে। একই ধরনের চিত্র দেখা যায় সম্প্রতি নগরীর খুলশী আমবাগান এলাকায়, যেখানে মাদক কারবারি আলমগীরকে গ্রেপ্তার করতে গেলে পুলিশের ওপর হামলা চালায় কিশোর গ্যাংয়ের একটি দল, যাতে দুইজন উপপরিদর্শকসহ সাতজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পুলিশের ভাষ্যমতে, ওই মাদক কারবারি নিজেই একাধিক কিশোর গ্যাং গ্রুপ পরিচালনা করত মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য।


এই দুটি ঘটনা একসাথে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, কিশোর অপরাধের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী চক্রের দ্বারা কিশোরদের ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ। পারিবারিক তদারকির অভাব ও অভিভাবকদের ব্যস্ততা কিশোরদের একাকী করে তোলে, আর সেই শূন্যতা দখল করে নেয় এলাকার প্রভাবশালী সন্ত্রাসী বা মাদক কারবারিরা, যারা কিশোরদের অর্থ বা তথাকথিত “সম্মান” দেখিয়ে নিজেদের চক্রে টেনে নেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সোশ্যাল মিডিয়ার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, যেখানে সহিংসতা প্রায়ই মহিমান্বিত হয়ে উপস্থাপিত হয়, এবং মাদকের সহজলভ্যতা, যা কিশোরদের প্রথমে আসক্ত করে পরে অপরাধী চক্রের বাধ্য সদস্যে পরিণত করে। দারিদ্র্য ও শিক্ষার সুযোগের অভাবও এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করে, কারণ অভাবী কিশোররা সহজেই আর্থিক প্রলোভনে পা দেয়।
বাকলিয়া ও খুলশীর ঘটনা দুটি থেকে স্পষ্ট, শুধু কিশোরদের শাস্তি দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়—বরং যেসব প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী কিশোরদের ব্যবহার করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কিশোররা তাদের হাতিয়ার হয়ে ওঠার সুযোগ না পায়। পাশাপাশি পরিবারকে সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে এবং তাদের মানসিক অবস্থার প্রতি মনোযোগী হতে হবে, যাতে সেই শূন্যতার সুযোগ কেউ নিতে না পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাউন্সেলিং সেবা ও নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে কিশোররা সঠিক পথের দিশা পায়। শাস্তির চেয়ে সংশোধন ও পুনর্বাসনের ওপর জোর দিতে হবে, যেমনটা শিশু আইনেও নির্দেশিত আছে, এবং একইসাথে স্থানীয় পর্যায়ে খেলাধুলা, সংস্কৃতিচর্চা কিংবা যুব সংগঠনের মাধ্যমে কিশোরদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে, যাতে তারা অপরাধী চক্রের প্রলোভনে পা না দেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও এলাকাভিত্তিক গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে প্রাপ্তবয়স্ক নিয়ন্ত্রকদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি কিশোরদের সঙ্গে মানবিক ও সংবেদনশীল আচরণ বজায় রাখতে হবে।
কিশোর অপরাধ কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়—এটি পরিবার, সমাজ, প্রশাসন ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। বাকলিয়া ও খুলশীর ঘটনা প্রমাণ করে, কিশোররা প্রায়ই বৃহত্তর অপরাধ চক্রের শিকার, তাই প্রকৃত সমাধান নিহিত সেই চক্রগুলো ভাঙার মধ্যে, শুধু কিশোরদের দোষারোপ করার মধ্যে নয়। আজকের সংশোধিত ও সুরক্ষিত কিশোরই আগামী দিনের দায়িত্বশীল নাগরিক।


জয়নাল আরেফিন
শিক্ষার্থী, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *