কোরবানির চামড়ার সচেতন ব্যবস্থাপনাই হতে পারে অর্থনীতি ও পরিবেশ রক্ষার বড় শক্তি

Spread the love


ঈদ উল আযহা, মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। ত্যাগ, সহমর্মিতা ও মানবিকতার এই মহান শিক্ষার পাশাপাশি কোরবানির পশুর চামড়া দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতি বছর ঈদুল আযহার সময় বাংলাদেশে লাখ লাখ পশু কোরবানি দেওয়া হয় এবং বিপুল পরিমাণ চামড়া সংগ্রহ করা হয়। এই চামড়া দেশের চামড়া শিল্পের প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে এই সম্ভাবনাময় সম্পদ অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়, যা অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি পরিবেশগত সমস্যাও সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশের চামড়া শিল্প দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিত। কাঁচা চামড়া থেকে উৎপাদিত জুতা, ব্যাগ, বেল্ট ও অন্যান্য পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। বিশেষ করে ঈদুল আযহার সময় সংগৃহীত চামড়া পুরো বছরের শিল্প কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সঠিক সংরক্ষণ ও সংগ্রহ ব্যবস্থার অভাবে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়ে যায়।


চামড়া ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সংরক্ষণ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা ও অসচেতনতা। অনেকেই কোরবানির পর চামড়ায় পর্যাপ্ত লবণ ব্যবহার করেন না বা দীর্ঘ সময় খোলা জায়গায় ফেলে রাখেন। ফলে চামড়া দ্রুত পচে যায় এবং এর গুণগত মান নষ্ট হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে সঠিক পরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় চামড়া সময়মতো আড়ত বা ট্যানারিতে পৌঁছায় না।
এছাড়া চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় পরিবেশ দূষণের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্যানারি শিল্প থেকে নির্গত বর্জ্য সঠিকভাবে পরিশোধন না করা হলে তা নদী ও মাটির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে রাসায়নিকযুক্ত তরল বর্জ্য জলজ প্রাণী ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। তাই পরিবেশবান্ধব ট্যানারি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
এই সমস্যার সমাধানে সরকার, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রথমত, কোরবানির আগে থেকেই চামড়া সংরক্ষণ বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো জরুরি। টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মসজিদ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মানুষকে জানাতে হবে—কিভাবে সঠিকভাবে চামড়া ছাড়াতে ও সংরক্ষণ করতে হয়।
চামড়া সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ লবণ ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে একটি গরুর চামড়ায় ৫ থেকে ৮ কেজি পর্যন্ত লবণ ব্যবহার করা উচিত, যাতে চামড়া দীর্ঘ সময় ভালো থাকে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সংগ্রহ কেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে চামড়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যাবে।
সরকারের উচিত আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব ট্যানারি শিল্প গড়ে তোলা এবং বর্জ্য পরিশোধনের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে চামড়া ব্যবসায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মৌসুমি ব্যবসায়ী ও এতিমখানাগুলো সঠিকভাবে উপকৃত হতে পারে।
অন্যদিকে, তরুণ সমাজ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তারা চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, কোরবানির চামড়া শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবের অংশ নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, শিল্প এবং কর্মসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই খাতকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। তাই প্রয়োজন সচেতনতা, দক্ষতা এবং সমন্বিত উদ্যোগ। তাহলেই ঈদুল আযহার চামড়া হতে পারে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার এক বড় সম্ভাবনার দ্বার।

মোঃ আবির আল হাসনাঈন
শিক্ষার্থী, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *