কুবিতে শিক্ষার্থীকে রাতভর র‍্যাগিংয়ের অভিযোগ, ‘ল্যাংটা করে হল ঘুরানোর’ হুমকি

Spread the love

কুবিতে শিক্ষার্থীকে রাতভর র‍্যাগিংয়ের অভিযোগ, ‘ল্যাংটা করে হল ঘুরানোর’ হুমকি

কুবি প্রতিনিধি:

রাতভর র‍্যাগিং, অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল, মারতে তেড়ে আসা, কাপড় খুলে পুরো হল ঘুরানোর হুমকি ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বিজয়-২৪ হলের ৩১২ নম্বর কক্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী ও অর্থনীতি বিভাগের তিন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে।

ভুক্তভোগী আমির হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। অভিযুক্তরা হলেন একই বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের মো. হাসান, অন্তু দাস ও মো. সরওয়ার সার্থক রিয়াদ। এ ঘটনায় গত ২৩ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন আমির।

অভিযোগপত্রে আমির উল্লেখ করেন, গত ১৬ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে তার বন্ধু অপূর্বকে অর্থনীতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রিয়াদ ফোন করে ৩১২ নম্বর কক্ষে ডাকেন। পরে আমির, অপূর্ব ও ইউসুফ ইকবাল সেখানে যান। ওই কক্ষে রিয়াদ, অন্তু দাস ও হাসানসহ একই বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।

একপর্যায়ে ইউসুফ ও অপূর্বকে এক পাশে রেখে আমিরকে আলাদা করে দাঁড় করিয়ে র‍্যাগ দেওয়া শুরু হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ভুক্তভোগীর ভাষ্য, হলে ওঠার পর এতদিন হয়ে গেলেও কেন তিনি সিনিয়রদের সঙ্গে দেখা করেননি এবং দেখা করতে হলে কেন ফোন করে ডাকতে হবে—এসব বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করেন রিয়াদ। অন্তু দাস বাসে দেখা হওয়ার পর সালাম না দেওয়া ও কথা না বলার বিষয় নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। আর হাসান এক বছর ধরে পরিচিত না হওয়া এবং দেখা না করার বিষয়েও প্রশ্ন করেন।

অভিযোগপত্রে আমির আরও উল্লেখ করেন, রাত ১২টার পর তার সঙ্গে অকথ্য ভাষায় গালাগাল শুরু হয়। অভিযুক্তরা বারবার তাকে মারতে তেড়ে আসেন। ধমক ও গালাগালের মাধ্যমে রাত প্রায় ৩টা পর্যন্ত তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা হয়।

এ সময় তাকে ‘মাদারচুদ’, ‘বাইনচুদ’, ‘বোকাচোদা’সহ বিভিন্ন অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করা হয় বলে অভিযোগ করেন আমির। লুঙ্গি পরা থাকায় তাকে বলা হয়, ‘লুঙ্গি খুলে ল্যাংটা করে পুরো হল ঘুরাব।’ তাকে ‘ফুটবল’ হিসেবে হলের বিভিন্ন জায়গায় ঘোরানো এবং তাদের ইচ্ছামতো কিছু করার কথাও বলা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া তাকে ‘র‍্যাগিংয়ের পাঁচটি উপকারিতা’ বলতে বলা হয় এবং দীর্ঘ সময় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। একপর্যায়ে লুঙ্গি খুলে প্যান্ট পরে আসার জন্য তাকে নিচতলায় পাঠানো হয়। আমির বারবার ক্ষমা চেয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করলেও অভিযুক্তরা তাতে কর্ণপাত করেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ঘটনার দিনই তিনি বিষয়টি অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যানকে জানান। পরে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের র‍্যাগিংসংক্রান্ত কয়েকটি ভিডিও ক্লিপ ও অডিও ভয়েস কল রেকর্ড চেয়ারম্যানকে দেখানো ও শোনানো হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন আমির। এরপর চেয়ারম্যান ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের সিনিয়রদের বিষয়টি মীমাংসা করে দিতে বলেন বলে দাবি তার।

আমিরের অভিযোগ, এরপর কয়েকজন সিনিয়র তাকে ভয় দেখিয়ে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকে আরও চার বছর থাকতে হবে এবং তাকে হলে গিয়ে অভিযুক্তদের কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইতে হবে। পরে তিনি অভিযুক্তদের কাছে ক্ষমা চাইতে গেলে তারা তাকে আরও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। রাত ৩টার পরও তাকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছিল না। একপর্যায়ে আর সহ্য করতে না পেরে তিনি দৌড়ে হলের বাইরে চলে আসেন। এরপর থেকে তিনি বিজয়-২৪ হলে আর যাননি বলে জানান।

আমির হোসেন বলেন, “এতদিন শুধু বিভাগের ওপর ভরসা করে ছিলাম এবং বিভাগীয় চেয়ারম্যান সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পরিস্থিতি তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। বর্তমানে পড়ালেখা, ঘুম ও খাওয়া-দাওয়াসহ সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। নিজের জীবন নিয়েও হুমকির মুখে আছি। এখনো আমার বেডসহ জিনিসপত্র হলে রয়ে গেছে। ভয়ে সেগুলো আনতে যেতে পারিনি।”

অভিযোগপত্রে আমির আরও উল্লেখ করেন, র‍্যাগিংয়ের পর তিনি অন্তু দাসকে ফোন করে নিজের পরিচয় গোপন রেখে কথা বলেন। ওই ফোনে তিনি বলেন, ‘আপনি রাজনীতি করেন? আমার পরিবারের সবাই রাজনীতি করে। ক্যাম্পাস থেকে উঠিয়ে নিয়ে লাশ গুম করে দেব।’ তবে অভিযোগপত্রেই তিনি উল্লেখ করেন, ওই হুমকি দেওয়ার উদ্দেশ্য তার ছিল না। মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ক্ষোভ ও রাগের বশে তিনি কথাগুলো বলেছিলেন বলে দাবি করেন।

এ ঘটনার পর তার বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন আমির। তিনি জানান, গত ২০ আগস্ট রাতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কোটবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির এসআই জিয়াউর রহমান তাকে ফাঁড়িতে ডাকেন। সেখানে তিনি তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া র‍্যাগিংয়ের বিষয়টি পুলিশকে জানান। পরে ওই পুলিশ কর্মকর্তা তাকে পাল্টা জিডি করার পরামর্শ দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিষয়টি অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যানকে জানালে চেয়ারম্যান ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের সিনিয়রদের পরামর্শ নিতে বলেন বলেও দাবি করেন আমির।

অভিযুক্তদের বক্তব্য

অভিযোগ অস্বীকার করে অন্তু দাস বলেন, “এগুলো ভিত্তিহীন। এ ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি। এ বিষয়ে আমার সঙ্গে বিভাগের কোনো যোগাযোগ হয়নি।”

অভিযুক্ত মো. হাসান বলেন, “কোনো র‍্যাগিং দেওয়া হয়নি। সে যে অভিযোগগুলো করছে, সেগুলো মিথ্যা। তার মানসিকভাবে অসুস্থতার বিষয় রয়েছে। আর যে গালাগালির কথা বলা হচ্ছে, সেটি অন্য একটি প্রসঙ্গে বলা হয়েছে।”

অভিযুক্ত রিয়াদকে ফোন করা হলে তিনি কল রিসিভ করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর কল রিসিভ করেননি।

বিভাগের বক্তব্য

অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. শামীমুল ইসলাম বলেন, “আমি বিষয়টি সম্পর্কে জেনেছি। হলের কোনো একটি বিষয় নিয়ে সিনিয়ররা জুনিয়রদের ডেকে কথাবার্তা বলেছে। একটু দীর্ঘ সময় ধরেই কথা বলেছিল। ছেলেটি কিছুটা মানসিকভাবে কষ্ট পেয়ে হল ছেড়ে দিয়েছিল। পরবর্তীতে আমি সবাইকে ডেকে বলেছি।”

প্রক্টরিয়াল বডির বক্তব্য

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. আব্দুল হাকিম বলেন, “এ বিষয়ে আমরা প্রক্টরিয়াল বডির মিটিং করেছি। ঘটনা যেহেতু অর্থনীতি বিভাগের, সেজন্য বিভাগীয় প্রধানের সঙ্গে আগে কথা বলে তারপর জানাতে পারব।”

পুলিশের বক্তব্য

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কোটবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির এসআই জিয়াউর রহমান বলেন, “অন্তু দাস নামে একজন শিক্ষার্থী কিছুদিন আগে একটি অনলাইন জিডি করেছেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, তাকে ফোন করে মেরে ফেলা ও লাশ গুম করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। যে শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে, তাঁর নাম আমির। তারা সবাই ইকোনমিকস বিভাগের শিক্ষার্থী।”

তিনি বলেন, “আমি তদন্তের স্বার্থে আমিরের সঙ্গে কথা বললে সে জানায়, অন্তু দাসসহ তিনজন মিলে তাকে র‍্যাগ দিয়েছে। যেহেতু বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন, তাই আমরা বিস্তারিত খোঁজখবর নিচ্ছি।”

এসআই জিয়াউর রহমান আরও বলেন, “এটা যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সিনিয়র-জুনিয়রের সম্পর্কের বিষয়, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি যদি এটি সমাধান করে ফেলে, তাহলে আমরা সেভাবেই রিপোর্ট জমা দেব। অন্যথায় অনেকেই হয়রানির শিকার হতে পারে। আমরাও চাই বিষয়টি যেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মাধ্যমেই সমাধান হয়।”

হল প্রশাসনের বক্তব্য

বিজয়-২৪ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান খান বলেন, “আমাকে বিষয়টি সম্পর্কে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। আমি চাই, কোনো শিক্ষার্থীর সঙ্গেই যেন জুলুম করা না হয়। এ বিষয়ে যদি কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, তাহলে তাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *