কুবিতে সিন্ডিকেট ও আপগ্রেডেশন বন্ধ রাখতে ছাত্রদলের ফের হুমকির অভিযোগ

Spread the love

কুবিতে সিন্ডিকেট ও আপগ্রেডেশন বন্ধ রাখতে ছাত্রদলের ফের হুমকির অভিযোগ

কুবি প্রতিনিধি:

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) সিন্ডিকেট সভা বন্ধ রাখতে উপাচার্যকে ফের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রদলের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল মামুন, সদস্য সচিব মোস্তাফিজুর রহমান শুভ এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল বাশার।

বিশ্ববিদ্যালয় ও ছাত্রদলের সূত্র অনুযায়ী, গত ২৯ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।

বিশ্ববিদ্যালয় ও ছাত্রদলের সূত্র থেকে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হায়দার আলীর সঙ্গে দেখা করতে যান কুবি শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করে প্রশাসনের দোষত্রুটি ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন চাওয়া-পাওয়া নিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলেন তারা। তবে কথোপকথনের এক পর্যায়ে অন্যান্য নেতাকর্মীদের বের করে দেন শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল মামুন, সদস্য সচিব মোস্তাফিজুর রহমান শুভ এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল বাশার।

নেতাকর্মীদের বের করে দিয়ে তারা উপাচার্যকে বলতে শোনা যায়, “স্যার, আপনি সম্মানিত মানুষ। আপনাকে আমরা বেশি কিছু বলতে চাই না। ধন্যবাদ যে আপনি আমাদের কথা রেখে সিন্ডিকেট ও আপগ্রেডেশন বন্ধ রেখেছিলেন। বাকি সময়ও বন্ধ রাখবেন। এমনকি কোনো নিয়োগ বোর্ডও দেবেন না।”

জবাবে উপাচার্য অধ্যাপক ড. হায়দার আলী তাদের বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী প্রতি তিন মাসে একবার সিন্ডিকেট করা আবশ্যক, অন্যথায় সরকারের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। গত ৩০ মার্চই সময় পার হয়ে গেছে। তাই সিন্ডিকেট করতেই হবে।” উপাচার্য আরও আশ্বাস দেন যে, এই সিন্ডিকেটে নতুন কোনো নিয়োগের বিষয় নেই, শুধু শিক্ষকদের নিয়মিত আপগ্রেডেশন রয়েছে।

কথার এক পর্যায়ে উপাচার্য বলেন, অধিকাংশ সদস্য কুমিল্লায় আসতে ইচ্ছুক না হওয়ায় তারা এবার ঢাকায় সিন্ডিকেট সভা করতে বাধ্য হচ্ছেন। এই কথা শুনে ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, “আপনি ঢাকায় সিন্ডিকেট করলে আর কুমিল্লায় আসতে পারবেন না। মনে হয় না আপনি আর চেয়ারে বসতে পারবেন।”

এ সময় সাংবাদিকরা তাদের বাধার বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করছে উল্লেখ করা হলে আহ্বায়ক মামুন বলেন, “সাংবাদিক সংবাদ করছে আমরা বাধা দিয়েছি, তো কী হয়েছে?”

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০০৬ এর কার্যপরিচালনা বিধি অনুযায়ী প্রতি তিন মাসে অন্তত একবার সিন্ডিকেট সভা আয়োজনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও গত চার মাস ধরে তা থমকে আছে। সর্বশেষ গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৮তম সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর দুই দফায় তারিখ নির্ধারণ করা হলেও ছাত্রদল ও বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের চাপ ও হুমকির মুখে প্রশাসন তা স্থগিত করতে বাধ্য হয় বলে জানা গেছে।

দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেট ও আপগ্রেডেশন বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত না হওয়ায় বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ২১ জন শিক্ষক ও ৪ জন কর্মকর্তাসহ মোট ২৫ জনের পদোন্নতি (প্রমোশন) প্রক্রিয়া আটকে রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পদোন্নতি প্রত্যাশী এই ২১ জন শিক্ষকের মধ্যে যারা সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদের জন্য আবেদন করেছেন তারা হলেন পরিসংখ্যান বিভাগের ড. জে. এম. আদিব সালমান চৌধুরী, অর্থনীতি বিভাগের নবীন কর কুন্তু, ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের সাইদুল আল-আমীন ও মাহবুব আলম এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ড. মো. খলিলুর রহমান।

অন্যদিকে, সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন করেছেন পরিসংখ্যান বিভাগের প্রিয়াংকা পাল ও আফরিনা আক্তার মিশু, রসায়ন বিভাগের মো. রাসেল মনি ও ড. মোহাম্মদ জুলহাস উদ্দিন, সিএসসি বিভাগের মো. হাসান হাফিজুর রহমান, অর্থনীতি বিভাগের মোহাম্মদ নাসির হুসেইন, লোক প্রশাসন বিভাগের ড. কৃষ্ণ কুমার সাহা, আশিকুর রহমান ও মো. নাজমুল হক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ড. মো. বেলাল হুসাইন, মার্কেটিং বিভাগের ড. মো. আওলাদ হোসেন, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ড. মো. মঞ্জুর হোসেন, গণিত বিভাগের মো. আতিকুর রহমান এবং ইংরেজি বিভাগের ইসরাত জাহান নিমনী।
এছাড়াও প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন করেছেন বাংলা বিভাগের মো. গোলাম মাহমুদ পাভেল এবং আইসিটি বিভাগের কাশমী সুলতানা। এর মধ্যে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ড. মো. খলিলুর রহমান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ড. মো. বেলাল হুসাইন, মার্কেটিং বিভাগের ড. মো. আওলাদ হোসেন এবং বাংলা বিভাগের মো. গোলাম মাহমুদ পাভেলের পদোন্নতি বোর্ডের তারিখ কয়েকবার পরিবর্তন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সর্বশেষ আগামী ৬ মে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রার্থীদের বোর্ড হওয়ার কথা রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৭ মে ১০৯তম সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এ সভার এজেন্ডায় শিক্ষকদের পদোন্নতি (আপগ্রেডেশন), নতুন সিলেবাস প্রণয়ন, প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষক কাজী আনিছুল ইসলাম এবং ভুয়া নথি ব্যবহার করে শিক্ষক হওয়া আবু ওবায়দা রাহিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, নকলের দায়ে বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত, দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্ত সাবেক রেজিস্ট্রার মুজিবুর রহমান এবং জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত ডেপুটি রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনের বিষয়সহ অন্তত ৫০টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানা যায়।

সূত্র আরও জানায়, উপাচার্যের কার্যালয়ে তারা অভিযুক্তদের শাস্তি না দেওয়ার বিষয়েও কথা বলেন। ছাত্রদলের নেতারা বলেন, উপরে উল্লেখিত ব্যক্তিরা যদি দোষী হয়, তাহলে তাদের আরেক সিন্ডিকেটে শাস্তি দেওয়া যাবে।

হুমকি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “আমরা এ ধরনের কোনো কথাই বলিনি। আমরা বাস, খাবার-দাবার এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছি। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময় বাস নিয়ে আসলে প্রশাসন স্পষ্টভাবে সমাধান করে না কেন, বা আরেকবার একজন শিক্ষার্থীকে প্রশাসন ঝামেলায় ফেলেছিল ; এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু নেয়নি,এসব বিষয় নিয়েই কথা বলেছি। আমরা সিন্ডিকেট নিয়ে কোনো কথা বলিনি।”
সদস্য সচিব মোস্তাফিজুর রহমান শুভ বলেন, “আমি এ বিষয়ে জানি না, আমি সেখানে ছিলামও না।”

তবে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল বাশার বলেন, “আমি এসব বিষয়ে কথা বলিনি। আমরা কথা বলতে গিয়েছিলাম বাস আটকে চাঁদাবাজি এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়ে। আমরা এ ধরনের কোনো কথাবার্তা বলিনি; কেউ যদি বলে থাকে, সে বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই।”

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট না হওয়ায় বেশ কয়েকজন শিক্ষকের প্রমোশন বা আপগ্রেডেশন আটকে রয়েছে। তাদের অভিযোগ, সিন্ডিকেট না হলে তাদের প্রমোশনও হবে না; সঠিক সময়ে প্রমোশন না হলে তারা প্রাপ্য ভাতা (অ্যালাউয়েন্স) পাবেন না।

এ বিষয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. খলিলুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানান। মার্কেটিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. আওলাদ হোসেনের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হলে তিনিও পরে কথা বলবেন বলে জানান। বাংলা বিভাগের প্রভাষক মো. গোলাম মাহমুদ পাভেল বলেন, “আমাদের আপগ্রেডেশন বোর্ড বসার কথা ছিল। পরে আমাকে একটি ই-মেইলে জানানো হয় যে অনিবার্য কারণে বোর্ড স্থগিত থাকবে। হয়তো প্রশাসনিক জটিলতা কেটে গেলে বোর্ড বসবে। অনেকেরই প্রমোশন হতে বছর বা দেড় বছর সময় লাগে। তবে নির্ধারিত সময়ে না হলে আমি হয়তো আমার ভাতাটি পাব না।”

সহকারী রেজিস্ট্রার মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “সবাই যেন তাদের প্রাপ্য অধিকার অনুযায়ী সঠিক সময়ে প্রমোশন পায়।” আরেক কর্মকর্তা, কেন্দ্রীয় স্টোরের পরিচালক ও সহকারী রেজিস্ট্রার মো. মিনহাজুল আবেদীন মজুমদার বলেন, “আমি শুধু একটি কথাই বলব তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ।”

এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হায়দার আলী বলেন, নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে যাওয়ায় আমরা সিন্ডিকেট সভা করতে বাধ্য হচ্ছি; অন্যথায় আমাদের সরকারের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। ক্যাম্পাসে না করে ঢাকায় সিন্ডিকেট সভা কেন করা হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিন্ডিকেট সভার অধিকাংশ সদস্যের ব্যস্ততার কারণে তারা কুমিল্লায় আসতে পারছেন না; তাই ঢাকায় সভা করা হচ্ছে। সিন্ডিকেট সভার এজেন্ডা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তা দেখে বলতে হবে। কোনো নিয়োগের বিষয় আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিয়োগ নেই; তবে কিছু শিক্ষকের আপগ্রেডেশন রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *