আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসে বুটেক্সে গণতন্ত্রের নানা প্রশ্ন

Spread the love

আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসে বুটেক্সে গণতন্ত্রের নানা প্রশ্ন

সুব্রত কুমার পাল, বুটেক্স প্রতিনিধি

১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস। গণতন্ত্র মানে শুধু ভোটাধিকার কিংবা সরকার নির্বাচন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা, অংশগ্রহণ এবং নিরাপদে নিজের কথা বলার সুযোগ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গণতান্ত্রিক চর্চার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এখানেই গড়ে ওঠে মুক্ত চিন্তা, যুক্তিবোধ, নেতৃত্ব ও নাগরিক চেতনা। বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স) শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশ, প্রতিনিধিত্ব ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসে বুটেক্স শিক্ষার্থীদের এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন বুটেক্স প্রতিনিধি (নাম)।

বুটেক্সের ৪৮তম ব্যাচের ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী ধ্রুব সাহার দৃষ্টিতে গণতন্ত্রের পরিসর অনেক বিস্তৃত। তাঁর মতে, দেশের ক্ষমতা কাঠামোর প্রভাব থেকে কোনো প্রতিষ্ঠানই পুরোপুরি মুক্ত নয়। এর প্রভাব ক্যাম্পাসেও দেখা যায়, যেখানে ক্ষমতাসীনদের প্রভাব অনেক সময় শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে। তিনি মনে করেন, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের পরিবর্তে দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য ব্যাচ, বিভাগ ও হলভিত্তিক নির্দলীয় প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে ছাত্রসংসদ গঠন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা এবং সিন্ডিকেটে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বুটেক্সের ৪৯তম ব্যাচের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী ও বুটেক্স ছাত্রদল সদস্য মোসাইদুল ইসলাম তনিমের কাছে রাজনৈতিক অধিকার গণতান্ত্রিক অধিকারেরই অংশ। তাঁর মতে, বুটেক্সে সব ধরনের ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় রাজনীতি করতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশ, রাজনৈতিক চর্চা ও নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা মূলত সহিংস ও ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির বিরোধী উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনীতি পুরোপুরি বন্ধ না করে শিক্ষার্থীবান্ধব ও অধিকারমুখী রাজনৈতিক চর্চাকে উৎসাহিত করা উচিত। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে সব মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সুষ্ঠু ও সর্বদলীয় পরিবেশ তৈরির পক্ষে মত দেন তিনি।

রাজনৈতিক অধিকারের পাশাপাশি এর সীমারেখার বিষয়টিও তুলে ধরেন বুটেক্সের এ্যাপারেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মোঃ দুর্জয় মাহমুদ। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা এনসিপির সমন্বয় কমিটির সদস্য। তাঁর মতে, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ থাকলে তা সব সংগঠনের জন্য সমান হওয়া উচিত। যারা ক্যাম্পাসে রাজনীতি চান না, তাদের অবস্থানকেও সম্মান করার কথা বলেন তিনি। একই সঙ্গে অতীতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হওয়া ভয় ও অস্বস্তি দূর করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন দুর্জয়। শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অবস্থান জানতে নিরপেক্ষ জরিপের পক্ষেও তিনি মত দেন।

তবে গণতন্ত্রের প্রশ্নটি শুধু দলীয় রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বলে মনে করেন বুটেক্সের ৪৯তম ব্যাচের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী কাজী মুহা: ওসমান মাহদী। তাঁর মতে, বুটেক্সে শিক্ষার্থীরা এখনো সব ক্ষেত্রে নিজেদের মতামত পুরোপুরি স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারেন না। দাবি বা মতামত প্রকাশের পর ‘ট্যাগিং’ এর আশঙ্কা অনেকের মধ্যে দ্বিধা তৈরি করে। বড় সিদ্ধান্তের আগে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা ও মতামত নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলার পক্ষে তিনি। দলীয় রাজনীতি প্রসঙ্গে তাঁর অবস্থানও স্পষ্ট। অতীতের সহিংসতা, র‍্যাগিং ও ক্ষমতার অপব্যবহার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয় তৈরি করেছে বলে মনে করেন তিনি।

চার শিক্ষার্থীর বক্তব্যে মতের পার্থক্য স্পষ্ট হলেও একটি জায়গায় মিল রয়েছে গণতন্ত্র শুধু রাজনৈতিক অধিকার বা মতপ্রকাশের সুযোগ নয়; ভিন্নমতকে সম্মান করা এবং নিরাপদে সেই মত প্রকাশের পরিবেশও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসে বুটেক্সের সামনে তাই প্রশ্নটি শুধু ক্যাম্পাসে রাজনীতি থাকবে কি না, তা নয়। একজন শিক্ষার্থী কতটা স্বাধীনভাবে নিজের কথা বলতে পারেন, ভিন্নমত পোষণ করেও কতটা নিরাপদ থাকেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তে তাঁর মতামতের কতটা প্রতিফলন ঘটে গণতান্ত্রিক পরিবেশের প্রকৃত পরীক্ষা হয়তো সেখানেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *