২.৭৯ সিজিপিএ নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় ফুলফান্ডেড মাস্টার্সে, সিয়ামের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

Spread the love

২.৭৯ সিজিপিএ নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় ফুলফান্ডেড মাস্টার্সে, সিয়ামের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

সুমন গাজী, বাকৃবি প্রতিনিধি:

ছোটবেলা থেকেই ভালো ছাত্রের তকমা গায়ে জড়িয়ে যায়। প্রতিটি বোর্ড পরীক্ষায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে এগিয়ে চলা। নটরডেম কলেজ থেকে এইচএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস নিয়ে ভর্তি হন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে তার সিজিপিএ যখন দাঁড়ায় ২.৭৯, তখন যেন থমকে যায় সব স্বপ্ন।

কম সিজিপিএ নিয়ে হতাশা, সমালোচনা ও অপমান- সবকিছুই ঘিরে ধরে ড. এস. এম. নাজমুল হাসান সিয়ামকে। একপর্যায়ে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ভেঙে পড়েন। ফলাফলটি অনেকটা লুকিয়েও রাখতে চেয়েছিলেন। তবে যে ফলাফল একসময় তার কাছে বড় ধাক্কা ছিল, সেটিই পরে হয়ে ওঠে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণা।

হাল না ছেড়ে গবেষণাকে সঙ্গী করে নতুন করে নিজেকে তৈরি করেন সিয়াম। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার জিওনবুক ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপকের সম্পূর্ণ অর্থায়নে শারীরতত্ত্ব বিষয়ে দুই বছরের ফুলফান্ডেড মাস্টার্স প্রোগ্রামে সুযোগ পেয়েছেন তিনি। আজ তার শিক্ষাজীবনের পথচলা, সংগ্রাম আর অধ্যবসায়ের গল্প তুলে ধরা হলো।

মেইলে প্রথম স্কলারশিপের খবর জানার অনুভূতি
মেইলে স্কলারশিপের বিষয়টি জানতে পারার অনুভূতিটা আসলে অসাধারণ। এই সিজিপিএ নিয়ে দেশের বাইরে যেতে পারব, সেটা অনেকসময় অসম্ভব কল্পনা মনে হতো। শুধু মনে হতো, আল্লাহ আমাকে ফিরিয়ে দিবেন না। তাই চেষ্টা করে গেছি। আল্লাহ আমার কাজের মূল্য দিয়েছেন। আমার আম্মু-আব্বুর দোয়া বিফলে যায়নি।

সিজিপিএকে নিজের পরিচয় হতে দিবো না
কম সিজিপিএ নিয়ে সমালোচনা ও অপমানের মুখোমুখি হলেও হাল ছাড়িনি। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সিজিপিএকে নিজের পরিচয় হতে দেব না। গবেষণা, প্রকাশনা, কারিগরি দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দিয়ে নিজের যোগ্যতা তৈরি করেছি। সুযোগের অপেক্ষা না করে নিজেকেই সুযোগের উপযোগী করেছি।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার আগ্রহ যেভাবে তৈরি
সিয়াম বলেন, শুরুতে বিদেশে পড়াশোনার পরিকল্পনা ছিল না। মেডিকেলে ভর্তি হতে না পেরে বাবার পরামর্শে বাকৃবিতে ডিভিএমে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতে লক্ষ্য ছিল বিসিএস ক্যাডার হওয়া। প্রথম সেমিস্টারের ফলাফল বেশ হতাশ করে। মনে প্রশ্ন জাগে এর বাইরে কি কিছু করা সম্ভব?। বিদেশফেরত শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক গবেষণার সঙ্গে পরিচয়ের মাধ্যমে গবেষণায় আগ্রহ তৈরি করে। পরে পরজীবী গবেষণায় যুক্ত হয়ে সিরাজগঞ্জ, পাবনাসহ বিভিন্ন এলাকায় রক্তের নমুনা সংগ্রহ শুরু করেন। গবেষণাপত্র প্রকাশ শুরু হলে বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন আরও দৃঢ় হয়।

গবেষণার শুরু ও কোন কোন বিষয়ে গবেষণায় যুক্ত ছিলেন?
সিয়াম গবেষণার শুরু করেন ডিভিএমের দ্বিতীয় বর্ষে থাকাকালীন, রিসার্চ এসিস্ট্যান্ট হিসেবে। গবেষণার বিষয়ে তিনি বলেন, আমার মূল গবেষণার ক্ষেত্র অণুজীববিজ্ঞান, বিশেষ করে ভাইরাসবিজ্ঞান ও সংক্রামক রোগ। হেপাটাইটিস বি, মুরগির রক্তশূন্যতা ভাইরাস, গবাদিপশুর ভাইরাসজনিত ডায়রিয়া, ফাউলপক্স, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, বিড়ালের প্যানলিউকোপেনিয়া ও নিউক্যাসল রোগ নিয়ে কাজ করেছি। গবেষণার পাশাপাশি নমুনা সংগ্রহ, আণবিক জীববিজ্ঞান, ডিএনএ ও আরএনএ পৃথকীকরণ, পিসিআরসহ বিভিন্ন পরীক্ষাগার কৌশল এবং গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণের অভিজ্ঞতা রয়েছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা সহযোগিতা প্রকল্পে গর্ভবতী নারীদের মূত্রনালির সংক্রমণ নিয়েও কাজ করেছি।

পড়াশোনার সঙ্গে গবেষণা কীভাবে সামলেছেন?
পড়াশোনার পাশাপাশি বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি ও গবেষণা চালিয়ে যাওয়া আমার জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। নমুনা সংগ্রহের জন্য কখনো দুই-তিন দিন বাইরে থাকতে হয়েছে। আবার পরীক্ষার সময়ও গবেষণার কাজকে সময় দিতে হয়েছে। স্নাতক পর্যায়ে অনেক রাত পর্যন্ত গবেষণাগারে কাজ করেছি, কখনো রাত ২টা পর্যন্তও হয়েছে। গবেষণাকে আমি কখনো অতিরিক্ত কাজ হিসেবে দেখিনি, বরং ভবিষ্যৎ পেশার অংশ হিসেবে নিয়েছি।

কোচিংয়ে প্রস্তুতি না নিয়ে আইইএলটিএস স্কোর ৭!
আইইএলটিএসের প্রস্তুতিটা আমার জন্য একটু ভিন্ন ছিল। কোচিং সেন্টারে নিয়মিত না পড়ে মূলত নিজে নিজেই প্রস্তুতি নিয়েছি। ছোটবেলা থেকেই বাবা-মা ইংরেজি শেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় আমার ভিত্তিটা আগে থেকেই তৈরি ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষ থেকেই নিয়মিত শব্দভান্ডার চর্চা করতাম এবং ইংরেজি অনুষ্ঠান দেখতাম। পড়া, শোনা, বলা ও লেখার- চারটি দক্ষতার ওপরই গুরুত্ব দিই। সবচেয়ে নিবিড় প্রস্তুতি নিয়েছি প্রায় ১৪-১৫ দিন। শেষ পর্যন্ত আইইএলটিএসে ৭ স্কোর অর্জন করি।

কতগুলো গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে?
বর্তমানে আমার ১৬টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি দুটি বইয়ের অধ্যায়ে কন্ট্রিবিউটর হওয়ার সুযোগ হয়েছে। এর মধ্যে একটি ইতোমধ্যে প্রকাশিত এবং অন্যটি পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। তবে আমি শুধু গবেষণাপত্রের সংখ্যা দিয়ে নিজের অর্জনকে বিচার করি না। প্রতিটি গবেষণা প্রকল্পই আমাকে নতুন কিছু শেখার সুযোগ দিয়েছে। নতুন গবেষণাকৌশল আয়ত্ত করা, বিভিন্ন সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা এবং গবেষণার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন, প্রতিটি কাজ থেকে এসব শিখেছি।

উচ্চশিক্ষায় বিদেশ আগ্রহী নতুনদের উদ্দেশে পরামর্শ:
বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রথমেই নিজের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। শেষ বর্ষে গিয়ে প্রস্তুতি শুরু না করে ১ম/২য় বর্ষ থেকেই কোন দেশে, কোন বিষয়ে এবং কোন বৃত্তির মাধ্যমে যেতে চান ঠিক করা। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আগে থেকেই গুছিয়ে রাখতে হবে। পাশাপাশি ইংরেজি, যোগাযোগ, উপস্থাপনা ও গবেষণার দক্ষতা বাড়াতে হবে। গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষায় আগ্রহীদের যত দ্রুত সম্ভব গবেষণাগারের অভিজ্ঞতা নেওয়া উচিত। শুধু সিজিপিএ নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা না করলেও একে অবহেলা করা যাবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ধারাবাহিকতা।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *