৭৪-এর মার্চে শেখ মুজিবের সমালোচনায় গ্রেফতার, ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ কাব্যগ্রন্থ; অন্তর্ভুক্ত কবিতা ‘প্রাচীর থেকে কথা’
“আমি সমাজতন্ত্রের সেমিনারে যাই; জামাত শিবিরের সেমিনারেও যাই” -কবি আল মাহমুদ।
১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ গ্রেপ্তার হন কবি আল মাহমুদ। সে সময় তিনি জাসদ-সমর্থিত ‘গণকণ্ঠ’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পত্রিকাটিতে তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং রক্ষীবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা প্রকাশিত হতো। তাঁর গ্রেপ্তার, কারাবাস এবং পরবর্তী সাহিত্যকর্ম—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক ইতিহাসে তাঁর জীবনের এই পর্বটি গুরুত্বপূর্ণ।
আল মাহমুদের নিজের পরবর্তী বক্তব্য ও তাঁর কবিতার পাঠ থেকে দেখা যায়, কারাবাস তাঁর চিন্তাজগতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময় হয়ে উঠেছিল। জেলে থাকা অবস্থায় তিনি বই পড়ার পাশাপাশি ধর্মগ্রন্থ পাঠ করেন এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্যকর্মে ইসলামী ভাবধারা ও ধর্মীয় অনুষঙ্গ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর ২০০৪ সালের একটি সাক্ষাৎকারেও তিনি বলেন, জীবনে সবচেয়ে বেশি বই পড়েছেন জেলখানায় থাকার সময়। তাঁর ভাষায়, জেলে তখন তাঁর হাতে ছিল অফুরন্ত সময় এবং বই পড়েই তিনি সময় কাটাতেন।
এই কারাজীবনের পরবর্তী সাহিত্যিক প্রতিফলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যগ্রন্থে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অনুষঙ্গের পাশাপাশি কারাবন্দিত্ব, অবিচার, ন্যায়-অন্যায় এবং মানুষের অস্তিত্বের নানা প্রশ্ন উঠে এসেছে।
এই পর্বের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে আলোচিত কবিতাগুলোর একটি ‘প্রাচীর থেকে কথা’। কবিতাটিতে কারাগারের অভিজ্ঞতাকে হযরত ইউসুফ (আ.)-এর কারাবরণের সঙ্গে একটি প্রতীকী সম্পর্কের মধ্যে দেখা যায়। বন্দিত্ব এখানে শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়; বরং অন্যায়, ক্ষমতা, বিচার এবং মানুষের পরিণতি নিয়েও একটি বৃহত্তর ভাবনার জায়গা তৈরি করে।
কবিতার শেষাংশে আল মাহমুদ লিখেছেন—
“যদি ও বোঝে না কবি রাজাদের স্বপ্নের কী মানে, কিন্তু এটা তো জানে, হত্যাই হত্যা ডেকে আনে।”
এই সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা ‘জেলগেটে দেখা’। সেখানে কারাগারের বাইরে চলমান দুর্ভিক্ষ ও মানুষের দুর্দশার কথা উঠে এসেছে। কবি লিখেছেন—
“আমি জানি বাইরে এখন আকাল চলছে। ক্ষুধার্ত মানুষ হন্যে হয়ে শহরের দিকে ছুটে আসছে। সংবাদপত্রগুলোও না বলে পারছে না যে এ অকল্পনীয়। রাস্তায় রাস্তায় অনাহারী শিশুদের মৃতদেহের ছবি দেখে আমি কতদিন আমার কারাকক্ষের লোহার জালি চেপে ধরেছি। হায় স্বাধীনতা, অভুক্তদের রাজত্ব কায়েম করতেই কি আমরা সর্বস্ব ত্যাগ করেছিলাম।”
আল মাহমুদের ‘বোধের উৎস কই, কোন দিকে?’ কবিতাতেও ১৯৭৩ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার একটি চিত্র পাওয়া যায়—
“হঠাৎ গুলির শব্দ। চিৎকার, ধর ধর ধর কিন্তু আমি কাকে ধরবো? স্টেনগান কাঁধে নিয়ে হেঁটে যায় উনিশশো তেয়াত্তর সাল।”
মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়টি আল মাহমুদের কাছে নিছক বিজয়ের ধারাবাহিকতা ছিল না; রাষ্ট্র, রাজনীতি, সহিংসতা, দুর্ভিক্ষ ও ব্যক্তিগত নিপীড়নের অভিজ্ঞতাও তাঁর কবিতায় জায়গা করে নিয়েছিল।
কারাবাসের সময় তাঁর চিন্তাজগতে ধর্মীয় পাঠের যে প্রভাব পড়ে, পরবর্তী কাব্যগ্রন্থে তার প্রতিফলন আরও সুস্পষ্ট হয়। ফলে ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ শুধু একটি কাব্যগ্রন্থ নয়; আল মাহমুদের কবিজীবনে তাঁর পূর্ববর্তী সমাজতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল পরিসর থেকে আরও গভীর ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ভাবনার দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক দলিল হিসেবেও আলোচিত।
আমি সমাজতন্ত্রের সেমিনারেও যাই; জামায়াত-শিবিরের সেমিনারেও যাই
২০০৪ সালে কবি আল মাহমুদের গুলশানের ফ্ল্যাটে তাঁর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন বিধান রিবেরু। সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছিল তৎকালীন মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘ভোরের শিশির’-এর জন্য। সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় বিধান রিবেরুর সঙ্গে ছিলেন পত্রিকাটির সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন চপল, সম্পাদকীয় সহকারী খন্দকার মো. জসীম উদ্দিন, সহসম্পাদক আখতারুল আলম এবং আলোকচিত্রী সানজিদা শারমীন সোভা।
সাক্ষাৎকারটি ‘ভোরের শিশির’-এর ১৬তম সংখ্যা, বর্ষ ৩, চৈত্র ১৪১০/মার্চ ২০০৪ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে সাক্ষাৎকারগ্রহীতা বিধান রিবেরু এটি পুনঃপ্রকাশ করেন এবং NTV Online-ও সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করে। এই প্রকাশনা-তথ্যটি NTV-তে পুনঃপ্রকাশিত সাক্ষাৎকারের ভূমিকা এবং বিধান রিবেরুর নিজের পুনঃপ্রকাশিত সংস্করণ থেকে পাওয়া যায়।
সাক্ষাৎকারে মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, নিজের রাজনৈতিক অবস্থান, সমকালীন প্রগতিশীল লেখকসমাজ, তসলিমা নাসরিন এবং নিজের ধর্মীয় অবস্থান নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন আল মাহমুদ।
মুক্তিযুদ্ধে তাঁর নিজের অংশগ্রহণ সম্পর্কে তিনি বলেন—
“আমি থাকতাম রায়পুরা। যুদ্ধের সময় বামুটিয়া হয়ে আগরতলা চলে যাই। সেখানে প্রশিক্ষণ। তার পর তো সরাসরি যুদ্ধে।”
তৎকালীন প্রগতিশীল লেখকদের মধ্যে কারা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি ড. আনিসুজ্জামান, আসাদ চৌধুরী, মহাদেব সাহা, সিকান্দার আবু জাফর, নির্মলেন্দু গুণ ও আহমেদ ছফাসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন। একই প্রশ্নে তিনি কয়েকজন লেখক যুদ্ধে অংশ নেননি বলেও দাবি করেন। এগুলো সাক্ষাৎকারে আল মাহমুদের নিজের বক্তব্য; প্রত্যেক ব্যক্তির মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা আলাদাভাবে ঐতিহাসিক সূত্র দিয়ে যাচাই করার বিষয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কেও তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেন—
“অনেক উঁচু মাপের একজন নেতা। দেশের সেই ক্রান্তিকালে তাঁর মতোই একজন নেতার প্রয়োজন ছিল।”
এমনকি তিনি আরও বলেন—
“তাঁকে অস্বীকার করা মানেই দেশকে অস্বীকার করা।”
তবে একইসঙ্গে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিবের ভুল ছিল বলেও তিনি মন্তব্য করেন এবং জাতীয় সরকার গঠন করে নেতৃত্ব ভাগ করে দেওয়ার পক্ষে মত দেন।
আল মাহমুদের রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন নিয়েও সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করা হয়। তিনি বলেন, একসময় তিনি সমাজতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, ‘গণকণ্ঠ’ প্রকাশ করতেন এবং বামপন্থী পরিসরে নিয়মিত আড্ডা দিতেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাঁর দাড়ি ও ধর্মীয় জীবনযাপনের কারণে তাঁকে মৌলবাদী বলা হয়—এমন অভিযোগও তিনি করেন।
জামায়াত-শিবিরের সভায় তাঁর যাতায়াত প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তাঁর উত্তর ছিল—
“আমি সব সভা-সেমিনারেই যাওয়ার চেষ্টা করি। যেমন সমাজতন্ত্রের সেমিনারেও যাই, তেমনি জামায়াত-শিবিরের সেমিনারেও যাই।”
এরপর তিনি বলেন—
“আর জামায়াত-শিবিরের সভাতে যাই বলে আমাকে রাজাকার বলা হয়, কিন্তু ওদের সভা-সেমিনারে গিয়ে আমি কী বলি সেটা শোনার জন্য কেউই যায় না। এখন মনে হয়, দেশের জন্য যুদ্ধ করে রাজাকার উপাধিটাই আমার প্রাপ্য।”
ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তাঁর উত্তর ছিল আরও সরাসরি—
“দাড়ি রাখলে আর ধর্মভীরু হলেই যদি মৌলবাদী হয়, তবে অবশ্যই আমি মৌলবাদী।”
তবে একই সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেকে কেবল একটি রাজনৈতিক বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর কবি হিসেবে দেখতে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন—
“সত্যি বলতে কি, আমি একজন কবি। আর কবিরা কখনোই কারো একার নয়, সে সবার—সবার জন্য তার সমান ভালোবাসা।”
২০০৪ সালের এই সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে আল মাহমুদের বক্তব্যও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন—
“তিনি না থাকলে এ দেশ আজ স্বাধীন হতো না।”
শেখ মুজিবের বিকল্প হিসেবে অন্য কোনো নেতা একই ভূমিকা পালন করতে পারতেন—এমন বক্তব্যেরও তিনি বিরোধিতা করেন। তাঁর ভাষায়—
“কেউ কখনো কারো অলটারনেটিভ হতে পারে না। তাঁর মতো নেতা তখনো কেউ জন্মায়নি, আর ভবিষ্যতেও জন্মাবে না।”
তবে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিবের ভুল ছিল বলেও তিনি মন্তব্য করেন। জাতীয় সরকার গঠন করে নেতৃত্ব ভাগ করে দেওয়া হলে ভালো হতো কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন—
“হ্যাঁ, তা হতো। কিন্তু সে চেষ্টা শেখ মুজিব করেননি।”
তসলিমা নাসরিন সম্পর্কেও সাক্ষাৎকারে তাঁর বক্তব্য ছিল দ্বিমুখী। তিনি তাঁকে “প্রতিভাবান” বলে উল্লেখ করেন, তবে তাঁর লেখালেখি ও ব্যক্তিজীবনকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক গোষ্ঠীর ব্যবহারের বিষয়েও সমালোচনা করেন।
তরুণদের উদ্দেশে আল মাহমুদ পাঠের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন—
“তরুণদের মুখ্য কাজ হওয়া উচিত ‘পড়া’। সময় পেলেই পড়তে হবে। তাহলেই জ্ঞান অর্জন হবে, জীবনে অনেক বড় হওয়া যাবে। আর সব সময় মনে রাখতে হবে, পড়ার কোনো বিকল্প নেই।”
আল মাহমুদের জীবনের এই দুই পর্ব—১৯৭৪ সালের কারাবাস ও তার পরবর্তী ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক বাঁক এবং ২০০৪ সালে নিজের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থান সম্পর্কে দেওয়া বক্তব্য—একসঙ্গে পড়লে তাঁর ব্যক্তিগত ও সাহিত্যিক বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি পাওয়া যায়।
উৎস: বিধান রিবেরু, ‘দাড়ি রেখেছি বলে মৌলবাদী হয়ে গেছি’, ভোরের শিশির, সংখ্যা ১৬, বর্ষ ৩, চৈত্র ১৪১০/মার্চ ২০০৪। সাক্ষাৎকারটি পরবর্তীতে বিধান রিবেরুর ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে পুনঃপ্রকাশিত এবং NTV Online-এ প্রকাশিত হয়। ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ ও ‘প্রাচীর থেকে কথা’-সংক্রান্ত তথ্য আল মাহমুদের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ও সংশ্লিষ্ট সাহিত্যিক সূত্রের ভিত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

