শ্ববিদ্যালয়গুলোর হল এবং ক্যান্টিনে খাবারের মান: অভিযোগগুলো কি শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা?
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা মানেই শুধু ক্লাস, পরীক্ষা আর অ্যাসাইনমেন্ট নয়। আবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য হলের জীবন তার চেয়েও অনেক বড়। পড়াশোনা, ঘুম, আড্ডা কিংবা নানা ব্যস্ততার পাশাপাশি প্রতিদিনের খাবারের জন্যও তাদের নির্ভর করতে হয় হলের ডাইনিং বা ক্যান্টিনের ওপর। ফলে সেখানে কী রান্না হচ্ছে, কীভাবে রান্না হচ্ছে এবং খাবারটি আদৌ নিরাপদ কি না—এসব প্রশ্ন সরাসরি শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িত।
সমস্যা হলো, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ নতুন কিছু নয়। কখনো খাবারে পোকামাকড় পাওয়ার কথা সামনে আসে, কখনো বাসি খাবার নিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করেন। কোথাও আবার ক্যান্টিনের পরিবেশ নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়, কিন্তু কিছুদিন পর একই ধরনের অভিযোগ আবার ফিরে আসে।
এর একটি উদাহরণ পাওয়া যায় ৭ মে ২০২৩-এ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলে। সেদিন আবাসিক শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও বিশুদ্ধ পানির দাবিতে হলের গেট তালাবদ্ধ করে বিক্ষোভ করেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল, ডাইনিংয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ছিল এবং খাবারে প্রায়ই পোকামাকড় পাওয়া যেত। তারা জানান, বিষয়টি আগে কয়েকবার হল প্রশাসনকে জানানো হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি। হলের ডাইনিং ব্যবস্থাপনার পক্ষ থেকে খাদ্যের মান ধরে রাখার ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি ও সীমিত ভর্তুকির সমস্যার কথাও বলা হয়। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন প্রত্যাহার করেন।
দুই বছর পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসে। ৯ আগস্ট ২০২৫-এ বিশ্ববিদ্যালয়ের এ এফ রহমান হলের শিক্ষার্থীরা ক্যান্টিন ও পাশের একটি দোকানে তালা ঝুলিয়ে দেন। অভিযোগ ছিল, সেখানে অস্বাস্থ্যকর ও বাসি খাবার বিক্রি করা হচ্ছিল। ঘটনাটি শুরু হয় একজন শিক্ষার্থী খাবার নেওয়ার আগে ক্যান্টিনের কর্মীর হাত না ধোয়ার বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানানোর পর। পরে হলের আবাসিক শিক্ষক ও সহকারী প্রক্টররা ক্যান্টিন পরিদর্শন করেন এবং সেখানে বাসি খিচুড়ি ও নষ্ট ডিম দেখতে পান। পরদিন প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়।
এই দুটি ঘটনা দুই বছরের ব্যবধানে দুই ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটেছে। তবু মিলটা চোখে পড়ার মতো। এক জায়গায় শিক্ষার্থীরা অস্বাস্থ্যকর খাবার ও বিশুদ্ধ পানির দাবি তুলেছেন, অন্য জায়গায় বাসি খাবার ও খাবার প্রস্তুতের স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দুটো ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল মোটামুটি একই—খাবার এমন হতে হবে, যা তারা নিশ্চিন্তে খেতে পারেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও দীর্ঘদিন ধরে হল ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। ৬ মে ২০২৬-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) বিভিন্ন ক্যান্টিন ও ক্যাফেটেরিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহের অভিযোগ তুলে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়ে লিখিত আবেদন করে। এর কিছুদিন পর, ২১ জুলাই ২০২৬ রাতে শেখ মুজিবুর রহমান হলের পুরাতন ভবনের ক্যান্টিনে খাবার খেতে গিয়ে এক শিক্ষার্থী তরকারির মধ্যে কেঁচো দেখতে পান, আর প্রশাসন বিষয়টি তদন্তে নামে। তাদের অনেকের বক্তব্য ছিল, অভিযোগের পর কিছুদিন পরিস্থিতির উন্নতি হলেও পরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
এখানে একটি বিষয় আলাদা করে দেখা দরকার। ক্যান্টিনের খাবার স্বাদে খারাপ হওয়া আর খাবার নিরাপদ না হওয়া এক বিষয় নয়। খাবার স্বাদে ভালো হতে পারে, দামও তুলনামূলক কম হতে পারে; কিন্তু রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা, খাবার সংরক্ষণ, কর্মীদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি কিংবা কাঁচামালের মান নিয়ন্ত্রণ করা না হলে সেই খাবার স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের অভিযোগকে শুধু ‘খাবার ভালো লাগে না’ ধরনের অভিযোগ হিসেবে দেখলে সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক আড়ালে থেকে যায়।
এই ধরনের অভিযোগের ধারাবাহিকতা ২০২৬ সালেও দেখা গেছে। ৫ জুলাই ২০২৬-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ক্যান্টিনে খাবারের মধ্যে ব্লেড পাওয়ার অভিযোগ ওঠে, আর তার এগারো দিন পর, ১৬ জুলাই ২০২৬-এ একই ধরনের অভিযোগ আসে কবি জসীমউদ্দীন হলের ক্যান্টিন থেকেও। ঘটনাগুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করে এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া হয়। একই সময়ে খাবারে অন্যান্য অনাকাঙ্ক্ষিত বস্তু পাওয়ার অভিযোগও সামনে আসে।
প্রশ্নটা তাই শুধু খাবারে কী পাওয়া গেল, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো—একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটার সুযোগ তৈরি হচ্ছে কেন?
প্রতিবার শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করার পর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে সমস্যাটি হয়তো সাময়িকভাবে থামতে পারে। কিন্তু একই ধরনের অভিযোগ যদি বছরের পর বছর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসে, তাহলে শুধু ক্যান্টিনের কর্মচারী বা ব্যবস্থাপককে দায়ী করে বিষয়টি শেষ করা যায় না। তখন দেখতে হয়, পুরো ব্যবস্থাটির কোথায় ঘাটতি রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খাবারের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মিত পরিদর্শন হয় কি না, কাঁচামালের মান কীভাবে যাচাই করা হয়, রান্নাঘরের স্বাস্থ্যবিধি কে দেখেন এবং শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পর কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া হয়—এসব প্রশ্নের উত্তরই সমস্যাটিকে বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আর এখানেই সংবাদঘটনার বাইরে গবেষণার তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীদের খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কে জ্ঞান কতটা, খাবার প্রস্তুতকারীদের স্বাস্থ্যবিধি কেমন এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে খাদ্য ব্যবস্থাপনার বাস্তব অবস্থা কী—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে বোঝা যায়, সমস্যাটি আসলে কতটা গভীরে গিয়েছে।
সমস্যার গভীরতা: গবেষণার তথ্য কী বলছে
ক্যান্টিনের খাবার নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগকে অনেক সময় ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয় হিসেবে দেখা হয়। কারও কাছে খাবার ভালো, কারও কাছে খারাপ—এমন পার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু নিরাপদ খাদ্যের প্রশ্নটি তার চেয়ে আলাদা। খাবার কতটা স্বাস্থ্যসম্মতভাবে প্রস্তুত হচ্ছে, কীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে এবং যারা খাবার তৈরি বা পরিবেশন করছেন তারা কতটা নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম মেনে চলছেন—এসবের উত্তর পাওয়া গেলে সমস্যাটিকে অনেক বেশি পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়।
এই জায়গায় গবেষণার তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। ২০২২ সালে বাংলাদেশের চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১,৫৩৪ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে একটি গবেষণা করা হয়। সেখানে খাদ্য প্রস্তুত, পরিচ্ছন্নতা, খাদ্যের মধ্যে দূষণ ছড়িয়ে পড়া এবং খাবার সংরক্ষণ—এসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও বাস্তব চর্চা যাচাই করা হয়। ফলাফল খুব আশাব্যঞ্জক ছিল না। খাদ্য নিরাপত্তা-সংক্রান্ত জ্ঞানের গড় স্কোর ছিল ৪১.৮ শতাংশ, আর নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনার বাস্তব চর্চার গড় স্কোর ছিল ৩৪.৯ শতাংশ। গবেষকেরা তাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে আরও কার্যকর শিক্ষামূলক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
এখানে একটা বিষয় খেয়াল করার মতো। গবেষণাটি সরাসরি হল ক্যান্টিনের খাবার কতটা নিরাপদ, সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কে জ্ঞান ও চর্চার একটি চিত্র দিয়েছে। তাই এই ফলাফলকে ক্যান্টিনের খাবারের মানের সরাসরি পরিমাপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা ও সঠিক চর্চার যে ঘাটতি রয়েছে, সেটি বোঝার ক্ষেত্রে গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ।
সমস্যার আরেকটি দিক রয়েছে খাবার তৈরির সঙ্গে যুক্ত মানুষদের নিয়ে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, ক্যান্টিন, রেস্তোরাঁ ও ক্যাম্পাসসংলগ্ন খাবারের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৭৮৮ জন খাদ্যকর্মীকে নিয়ে একটি বহুকেন্দ্রিক গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণায় খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কে তাদের জ্ঞান, মনোভাব ও বাস্তব চর্চা—তিনটি বিষয়ই বিবেচনায় নেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যকর্মীরাও ছিলেন।
এই গবেষণার গুরুত্ব এখানেই যে, খাবার নিরাপদ রাখার দায়িত্ব শুধু শিক্ষার্থীর নয়। একজন শিক্ষার্থী খাবার সম্পর্কে যত সচেতনই হোন, রান্নাঘরে যদি সঠিকভাবে খাদ্য সংরক্ষণ না করা হয় বা স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ না করা হয়, তাহলে তার পক্ষে সেই ঝুঁকি এড়ানো কঠিন। তাই খাদ্য প্রস্তুতকারী ও পরিবেশনকারীদের প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত তদারকি পুরো ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের ক্যান্টিন ও মেসে কর্মরত খাদ্যকর্মীদের নিয়েও ২০২৪ সালে একটি আলাদা গবেষণা প্রকাশিত হয়। সেখানে তাদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, জীবনযাপন, কর্মপরিবেশ এবং স্যানিটেশন চর্চা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের স্বাস্থ্য ও জীবনযাপন-সংক্রান্ত সমস্যা এবং স্যানিটেশন চর্চার বিভিন্ন দিক উঠে আসে। গবেষকেরা খাদ্যকর্মীদের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও কর্মপরিবেশের উন্নতির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
এই গবেষণাগুলো একসঙ্গে পড়লে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের খাবারের সমস্যা শুধু ‘রান্না ভালো হয় না’—এতটা সরল নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জ্ঞান ও আচরণ, রান্নাঘরের পরিবেশ, খাদ্য সংরক্ষণ, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং তদারকির মতো একাধিক বিষয়।
তবে গবেষণার ফলাফলকে সংবাদে প্রকাশিত প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে সরাসরি মিলিয়ে দেখাও ঠিক হবে না। একটি গবেষণা সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষের ওপর পরিচালিত হয়; অন্যদিকে একটি ক্যান্টিনে কোনো নির্দিষ্ট দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনা আলাদা বিষয়। কিন্তু দুটো দিক পাশাপাশি রাখলে সমস্যাটির একটি বড় ছবি পাওয়া যায়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ যেমন মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা দেখায়, গবেষণা তেমনি সেই বাস্তবতার পেছনে থাকা কিছু কারণ বোঝার সুযোগ দেয়।
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—জানা সত্ত্বেও সমস্যাগুলো কেন বারবার ফিরে আসে? শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়, আবার কিছুদিন পর নতুন অভিযোগ সামনে আসে। এই পুনরাবৃত্তির পেছনে কি শুধু ব্যক্তিগত অবহেলা রয়েছে, নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ব্যবস্থাপনার কাঠামোর মধ্যেই কিছু দুর্বলতা রয়েছে?
সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে এবার নজর দিতে হবে তদারকি, জবাবদিহি এবং ক্যান্টিন পরিচালনার পুরো ব্যবস্থার দিকে।
সমস্যার শিকড় কোথায়, আর সমাধানই বা কী?
একই ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসার পরও যদি সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হয়, তাহলে শুধু ক্যান্টিনের কর্মচারীদের দোষারোপ করে বিষয়টি শেষ করা যায় না। বরং প্রশ্ন করতে হয়—যে ব্যবস্থার মধ্যে এসব ঘটনা ঘটছে, সেখানে তদারকি কতটা কার্যকর এবং অনিয়মের জন্য জবাবদিহির ব্যবস্থা কতটা শক্ত?
ক্যান্টিনে খাবারের মান নিয়ন্ত্রণের কাজটি শুধু কোনো ঘটনা ঘটার পর শুরু হওয়ার কথা নয়। রান্নার আগে কাঁচামাল পরীক্ষা করা, খাবার কীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে তা দেখা, রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা পর্যবেক্ষণ করা এবং কর্মীদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কি না—এসব নিয়মিত দেখার বিষয়। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষও নিরাপদ খাবারের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা, সঠিকভাবে রান্না করা এবং নিরাপদ তাপমাত্রায় খাবার সংরক্ষণের মতো বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেয়।
কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় তদারকি দৃশ্যমান হয় তখনই, যখন কোনো ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটে গেছে। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, প্রশাসন পরিদর্শনে আসে, তদন্ত হয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্যান্টিন বন্ধও থাকে। কিছুদিন পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। তারপর আবার নতুন কোনো অভিযোগ সামনে আসে। এই চক্র ভাঙতে হলে প্রতিক্রিয়ামূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক তদারকিও দরকার।
জবাবদিহির বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একটি ক্যান্টিনে অনিয়ম ধরা পড়লে শুধু জরিমানা বা সাময়িক বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়। কেন এমন হলো, আগের কোনো অভিযোগ ছিল কি না, কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে একই ঘটনা ঠেকাতে কী পরিবর্তন আনা হয়েছে—এসব প্রশ্নেরও উত্তর থাকা দরকার। শিক্ষার্থীরা যদি সেই তথ্য জানতে পারেন, তাহলে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেও অবশ্য অস্বীকার করা যায় না। হলের ক্যান্টিনে তুলনামূলক কম দামে অনেক শিক্ষার্থীকে খাবার দিতে হয়। বাজারদর বাড়লে ক্যান্টিন পরিচালনাকারীদের ওপর চাপ পড়ে। কিন্তু কম খরচে খাবার দেওয়ার চেষ্টা আর অনিরাপদ খাবার পরিবেশন—এই দুটি বিষয় এক করে দেখা উচিত নয়। খরচ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করাও পরিচালনার দায়িত্বের অংশ।
ক্রিমিনোলজির চোখে বিষয়টি
ক্রিমিনোলজির শিক্ষার্থী হিসেবে এই সমস্যাটিকে আরেকভাবে দেখা যায়। অপরাধ বা অনিয়মের ক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তি কে এবং সে কেন নিয়ম ভাঙল—এই প্রশ্ন করলেই পুরো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। পরিবেশ, সুযোগ এবং তদারকির অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
Routine Activity Theory-এর একটি কেন্দ্রীয় ধারণা হলো কার্যকর তদারকির উপস্থিতি। কোনো জায়গায় পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকলে নিয়ম ভাঙার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যান্টিনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। রান্নাঘর নিয়মিত পরীক্ষা করা না হলে, খাদ্য সংরক্ষণ ঠিকভাবে হচ্ছে কি না কেউ না দেখলে কিংবা অভিযোগের পর কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে অনিয়ম করার ঝুঁকি বাড়ে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি ক্যান্টিনের অনিয়মকে সরাসরি ‘অপরাধ’ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। বরং ক্রিমিনোলজির দৃষ্টিভঙ্গি এখানে একটি বিষয় বুঝতে সাহায্য করে—নিয়ম প্রয়োগের দুর্বলতা কীভাবে অনিয়মের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

এখানে Broken Windows ধারণাটিও কিছুটা প্রাসঙ্গিক। ছোটখাটো অনিয়ম যদি বারবার উপেক্ষা করা হয়, তাহলে সেই পরিবেশে নিয়ম ভাঙাকে স্বাভাবিক বলে মনে হওয়ার ঝুঁকি থাকে। একটি অপরিষ্কার রান্নাঘর, পুরোনো খাবার সংরক্ষণ কিংবা স্বাস্থ্যবিধি না মানার মতো বিষয় শুরুতেই ঠিক করা গেলে বড় সমস্যায় যাওয়ার সম্ভাবনা কমে। তাই ছোট অনিয়মকে ‘এতটুকু তো হয়’ বলে এড়িয়ে যাওয়াও
ঠিক নয়।
তাহলে কী করা যেতে পারে?
সমাধানের জন্য খুব জটিল কোনো ব্যবস্থা সব সময় দরকার হয় না। বরং বিদ্যমান ব্যবস্থাকে আরও নিয়মতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ করা জরুরি।
প্রথম কাজ হতে পারে নিয়মিত খাদ্য নিরাপত্তা পরিদর্শন। প্রতিটি হল ক্যান্টিনে নির্দিষ্ট সময় পরপর রান্নাঘর, খাদ্য সংরক্ষণ এবং কাঁচামালের মান পরীক্ষা করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি আকস্মিক পরিদর্শনের ব্যবস্থাও থাকা দরকার। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ব্যবস্থাতেও মনিটরিং, এনফোর্সমেন্ট ও নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও এসব নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তদারকি জোরদার করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ক্যান্টিন পরিচালনায় স্বচ্ছতা বাড়ানো দরকার। ক্যান্টিনের চুক্তি, নির্ধারিত মানদণ্ড, পরিদর্শনের ফলাফল এবং অভিযোগের পর নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের জানানো যেতে পারে। এতে ক্যান্টিন পরিচালনাকারী এবং প্রশাসন—দুই পক্ষেরই জবাবদিহি বাড়বে।
তৃতীয়ত, সহজ অভিযোগ ব্যবস্থার প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানানোর জন্য নির্দিষ্ট অনলাইন বা অফলাইন ব্যবস্থা থাকতে পারে। তবে শুধু অভিযোগ নেওয়াই যথেষ্ট নয়; অভিযোগের কী ব্যবস্থা হলো, সেটিও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জানানো দরকার। একটি অভিযোগের পর ব্যবস্থা নেওয়া হলো কি না—এই তথ্যটি শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

চতুর্থত, খাদ্যকর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা, হাত ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, খাবার সংরক্ষণ এবং রান্নাঘর পরিষ্কার রাখার মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়মিত প্রশিক্ষণের অংশ হতে পারে। নিরাপদ খাদ্য নিয়ে বাংলাদেশে ইতোমধ্যে খাদ্য ব্যবসায়ীদের জন্য বিভিন্ন বাধ্যবাধকতা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সংক্রান্ত প্রবিধান রয়েছে।
আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ। ক্যান্টিনের খাবার নিয়ে অভিযোগ উঠলে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করাই যেন একমাত্র পথ না হয়। প্রমাণসহ অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার একটি কার্যকর কাঠামো থাকলে সমস্যা দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা বাড়ে।
বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ রয়েছে; এর পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে একাধিক প্রবিধান ও নির্দেশনাও রয়েছে। অর্থাৎ নীতিগত কাঠামো একেবারে অনুপস্থিত নয়। চ্যালেঞ্জ হলো এসব নীতির বাস্তব প্রয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি শুধু একটি ক্যান্টিনের খাবার নিয়ে নয়। একজন আবাসিক শিক্ষার্থী যখন প্রতিদিন একই জায়গা থেকে খাবার খান, তখন সেই খাবারের নিরাপত্তার ওপর তার নির্ভরতা তৈরি হয়। তাই নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করার দায়িত্বও ব্যক্তিগত পছন্দের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো ক্লাসরুম, লাইব্রেরি বা আবাসন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিরাপদ খাবারও তাদের সুস্থ শিক্ষাজীবনের অংশ। কোনো ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে যদি নিয়মিত তদারকি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে গুরুত্ব দেওয়া যায়, তাহলে হয়তো একই অভিযোগ বারবার শিরোনাম হওয়ার প্রয়োজন পড়বে না।
প্রশ্নটি তাই শুধু ‘আজকের খাবার কেমন?’—এতটুকু নয়। প্রশ্ন হলো, একটি বিশ্ববিদ্যালয় তার শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের খাবার কতটা নিরাপদ—এবং সেই নিরাপত্তার জন্য প্রতিষ্ঠানটি কতটা দায়বদ্ধ?
মোঃ আলাউল হোসাইন
১ম বর্ষ, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সাইন্স, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
তথ্যসূত্র
- Islam, M. N., Hassan, H. F., Amin, M. B., & Roy, N. (2022). Food safety and handling knowledge and practices among university students of Bangladesh: A cross-sectional study. Heliyon, 8(12), e11987.
https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC9720042/ - Food safety profile of university food handlers in Bangladesh: A multicenter cross-sectional study. (2024). Food and Humanity, 3, 100386.
https://www.sciencedirect.com/science/article/abs/pii/S2949824424001617 - বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপদ খাদ্য আইন ও বিধিমালা।
https://bfsa.gov.bd/pages/laws - Cohen, L. E., & Felson, M. (1979). Social Change and Crime Rate Trends: A Routine Activity Approach. American Sociological Review, 44(4), 588–608.
- Felson, M., & Clarke, R. V. (1998). Opportunity Makes the Thief: Practical Theory for Crime Prevention. Home Office Research Study 98.
- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এ এফ রহমান হলের ক্যান্টিনে বাসি ও অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশনের অভিযোগ, ৯–10 আগস্ট ২০২৫। The Daily Star.
https://www.thedailystar.net/news/bangladesh/education/news/students-lock-cu-hall-canteen-serving-stale-food-3959011 - ঢাবি ক্যান্টিনে পচা খাবার ও অনিয়মের অভিযোগ, ব্যবস্থা চায় ডাকসু, ৬ মে ২০২৬। RisingBD.
https://www.risingbd.com/campus/dhaka-university/648779 - ঢাবির মুজিব হলের ক্যান্টিনের খাবারে মিলল কেঁচো, ২১ জুলাই ২০২৬। Daily Bangla Post.
https://dailybanglapost.com/campus/52535 - ঢাবির জসীমউদ্দীন হলের ক্যান্টিনের খাবারে মিলল ব্লেড, ১৬ জুলাই ২০২৬ (এর আগে ৫ জুলাই জহুরুল হক হলেও একই অভিযোগ)। The Daily Campus.
https://thedailycampus.com/universities/264406
