স্বাস্থ্য সচেতনতাই হতে পারে রোগ প্রতিরোধের প্রথম ধাপ

Spread the love

অসুস্থ্য হলে আমরা চিকিৎসকের দ্বারে দ্বারে ঘুরি। কিন্তু আমরা জানি না খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কর্মকাণ্ড, পরিচ্ছন্নতা, টিকাদান, মানসিক সুস্থতা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা—সবকিছুর সমন্বয়ই স্বাস্থ্য সচেতনতার মূল। বাংলাদেশে সংক্রামক রোগের পাশাপাশি হৃদরোগ,ক্যান্সার,ডায়াবেটিস ছাড়াও অসংক্রামক রোগের বিস্তার বেড়ে যাওয়াতে ব্যক্তিগত সচেতনতার গুরুত্ব বেড়েছে অনেকাংশে৷
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ অসংক্রামক রোগ বর্তমানে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী। এসব মৃত্যুর ৫০ শতাংশের বেশি অকালমৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব রোগের অনেক ঝুঁকিই জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তামাক ব্যবহার, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও বায়ুদূষণ—এসবকে অসংক্রামক-এর গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ফলে রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধে সচেতন হওয়া অনেক বেশি কার্যকর কারণ প্রবাদ আছে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম৷
খাদ্যে সচেতন থাকা-
বাংলাদেশে ভাতের পাশাপাশি অতিরিক্ত লবণ, চিনি, ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার প্রবণতা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। রাস্তার পাশের খোলা পরিবেশের খাবারে বিভিন্ন ক্ষতিকারক অনুজীব বিদ্যমান যা দেহে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে৷ খাবারে শাকসবজি, ফল, ডাল, মাছ ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ ও চিনি কমানোর বিষয়ে পরিবার পর্যায় থেকেই সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।
বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো রোগ অনেক সময় দীর্ঘদিন উল্লেখযোগ্য উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে। এ কারণে বয়স ও ঝুঁকি অনুযায়ী রক্তচাপ, রক্তে শর্করা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
কায়িক পরিশ্রমে গুরুত্ব-
আধুনিক জীবনযাত্রায় দীর্ঘ সময় বসে থাকা, পড়াশোনা বা কাজের ফাঁকে কম নড়াচড়া করা এবং অবসর সময়ে অতিরিক্ত ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শারীরিক কর্মকাণ্ড কমে যাচ্ছে। নিয়মিত হাঁটা, খেলাধুলা বা অন্যান্য উপযুক্ত শারীরিক কর্মকাণ্ড স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা অসংক্রামক রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। তাই প্রতিদিনের রুটিনে বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী সক্রিয় থাকার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
শিশুদের টিকা প্রদান-
শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় টিকাদান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম। তবে ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৮১.৬ শতাংশ শিশু পূর্ণ টিকাদানের আওতায় থাকলেও প্রায় ৫ লাখ শিশু পূর্ণ টিকাদান থেকে বাদ পড়েছে। শহরের বস্তি ও প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে টিকাদানের ঘাটতি বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয়।
এ কারণে অভিভাবকদের সন্তানের টিকাদান সূচি সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং নির্ধারিত সময়ে টিকা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নিরাপদ পানি ও পরিচ্ছন্নতা
স্বাস্থ্য সচেতনতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা। ইউনিসেফ এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের নিরাপদ ব্যবস্থাপনার আওতায় থাকা পানীয় জলের হার বর্তমানে প্রায় ৩৯.৩ শতাংশ। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা নিরাপদ পানির প্রাপ্যতাকে আরও কঠিন করে তুলছে।
নিরাপদ পানি পান, খাবার তৈরির আগে ও পরে হাত পরিষ্কার করা এবং সঠিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা ব্যবহার করা ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রমণ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ।
সচেতনতাই হতে পারে প্রথম প্রতিরোধ
স্বাস্থ্য সচেতনতা কেবল ব্যক্তির দায়িত্ব নয়; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্র—সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পরিবারে স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস, বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যশিক্ষা, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং সঠিক স্বাস্থ্যতথ্যের প্রচার মানুষের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে অগ্রগতি সত্ত্বেও অসংক্রামক রোগের বাড়তি চাপ এবং স্বাস্থ্যব্যয়ের বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষকে নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা অনেক পরিবারের জন্য আর্থিক চাপ তৈরি করে।
তাই রোগে আক্রান্ত হওয়ার অপেক্ষা না করে প্রতিদিনের জীবনযাপনে স্বাস্থ্য সচেতনতার অভ্যাস গড়ে তোলাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর উদ্যোগ। স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড, পরিচ্ছন্নতা, টিকাদান, তামাকমুক্ত জীবন এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা—এই কয়েকটি অভ্যাসই একটি সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তোলার ভিত্তি হতে পারে।
তথ্যসূত্র:বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা,ইউনিসেফ,গণমাধ্যম
নাম:শফিউল আলম শাকিল
এমবিবিএস-১ম বর্ষ
জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ,সিলেট৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *