জুলাই ট্র্যাজেডি: শরীরে ৯৮টি ছররা গুলির আঘাত; পুণ্যভূমি সিলেটের দ্বিতীয় শহীদ সাংবাদিক এটিএম আবু তাহের মো. তুরাব

Spread the love

জুলাই ট্র্যাজেডি: শরীরে ৯৮টি ছররা গুলির আঘাত; পুণ্যভূমি সিলেটের দ্বিতীয় শহীদ সাংবাদিক এটিএম আবু তাহের মো. তুরাব

শাবিপ্রবি প্রতিনিধি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রাণ হারান পুণ্যভূমি সিলেটের দ্বিতীয় শহীদ সাংবাদিক এটিএম আবু তাহের মো. তুরাব। সত্য ও পেশাগত দায়িত্ব পালনে অবিচল এই সংবাদকর্মীর মৃত্যু শুধু সিলেট নয়, সমগ্র দেশের সাংবাদিক সমাজে গভীর শোক ও ক্ষোভের জন্ম দেয়।

এটিএম আবু তাহের মো. তুরাব দৈনিক নয়া দিগন্ত-এর সিলেট ব্যুরো প্রধান এবং সিলেটের ঐতিহ্যবাহী দৈনিক জালালাবাদ-এর স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর আগে তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) প্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠা, সাহসিকতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে সাংবাদিকতা করে তিনি সিলেটের গণমাধ্যম অঙ্গনে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন। সত্য প্রকাশে আপসহীন অবস্থান এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের জন্য তিনি সহকর্মী ও পাঠকমহলে বিশেষভাবে সমাদৃত ছিলেন।

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে সিলেট নগরের কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহ করছিলেন তুরাব। এ সময় পুলিশের ছোড়া ছররা গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন। সহকর্মীরা তাকে দ্রুত সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে অবস্থার অবনতি হলে নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

পরবর্তীতে প্রকাশিত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তার শরীরে ৯৮টি ছররা গুলির আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। এই তথ্য ঘটনাটির ভয়াবহতা ও নির্মমতার সাক্ষ্য বহন করে। তুরাবের মৃত্যু শুধু একটি প্রাণহানি ছিল না; এটি দেশের সাংবাদিক সমাজের জন্য এক গভীর বেদনার ঘটনা এবং সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দেয়।

ঘটনার পর নিহত সাংবাদিকের পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শুরুতে অভিযোগটি মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাসহ একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও মামলার বিচারিক কার্যক্রম এখনো চলমান। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছেন। একই দাবি জানিয়েছেন দেশের সাংবাদিক সংগঠন ও মানবাধিকারকর্মীরাও।

শহীদ সাংবাদিক তুরাবের স্মৃতিকে অম্লান রাখতে সিলেট প্রেসক্লাব তার নামে “এটিএম তুরাব স্মৃতি পদক” প্রবর্তন করেছে। এছাড়া বিভিন্ন সাংবাদিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিবছর তার স্মরণে আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল, স্মরণসভা ও বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করে। এসব উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তার পেশাগত সততা, সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ব্যক্তিগত জীবনেও তুরাবের মৃত্যু এক হৃদয়বিদারক অধ্যায়। শহীদ হওয়ার মাত্র দুই মাস আগে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। মৃত্যুর সময় তার স্ত্রী লন্ডনে অবস্থান করায় স্বামীর শেষ মুখটিও দেখতে পারেননি। নবদাম্পত্য জীবনের সমস্ত স্বপ্ন মুহূর্তেই শোকে পরিণত হয়।

সত্যের সন্ধানে, মানুষের জানার অধিকার নিশ্চিত করতে গিয়ে জীবন উৎসর্গকারী এটিএম আবু তাহের মো. তুরাব বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তার আত্মত্যাগ শুধু একজন সাংবাদিকের মৃত্যু নয়; এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা, জবাবদিহি, ন্যায়বিচার এবং সত্যের পক্ষে অবিচল থাকার এক উজ্জ্বল প্রতীক। জুলাই ট্র্যাজেডির ইতিহাসে তার নাম শ্রদ্ধা ও সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *