বাকৃবিতে আবারও হলকেন্দ্রিক সংঘাত, এক দিনের ব্যবধানে পাল্টাপাল্টি হামলা

Spread the love

সুমন গাজী বাকৃবি প্রতিনিধি:

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) আবাসিক দুই হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরপর দুই দিন মারামারির ঘটনা ঘটেছে। প্রথম ঘটনায় এক শিক্ষার্থীকে মারধর করে আহত এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার পরদিন পাল্টা আরেক হলের এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ পাওয়া যায়। পাল্টাপাল্টি মারামারির ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছে দুই পক্ষ। এ ঘটনায় দুই হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৩ নভেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের একটি কক্ষে ঈশা খাঁ হলের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী এস এম মেরাজুল আনোয়ার সিয়ামকে মারধর করা হয়। এ ঘটনায় সোহরাওয়ার্দী হলের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান ইমনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন সিয়াম। পাশাপাশি হামলায় ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মেজবাউল হক মিজু ও সোহরাওয়ার্দী হলের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইয়ামিনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। তবে মিজু এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সিয়ামের অভিযোগপত্রে বলা হয়, গত ৩ নভেম্বর বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে সোহরাওয়ার্দী হলের এ ব্লকের ১০২ নম্বর কক্ষে যান সিয়াম। সেখানে তার বন্ধু তাসনিমকে না পেয়ে কক্ষে অবস্থান করেন। কিছুক্ষণ পর ওই কক্ষে এসে ৬৫ ব্যাচের কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থী নাজমুল ইমন তাকে বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করতে থাকেন। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়।

সিয়ামের অভিযোগ, কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে ইমন তার ওপর শারীরিকভাবে হামলা চালান। এলোপাথাড়ি চড়, কিল ও ঘুষি মারেন। এতে তার ডান চোখে গুরুতর আঘাত লাগে। চোখের আশপাশে কালশিটে পড়ে যায়। পরে তিনি কোনোভাবে ওই কক্ষ থেকে বের হয়ে আসেন।

অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, ঘটনার সময় সোহরাওয়ার্দী হলের কয়েকজন শিক্ষার্থী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে হলটির ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক, ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী ইয়ামিনসহ কয়েকজনের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন সিয়াম। পরে বিষয়টি মীমাংসার প্রস্তাব দেওয়া হলে তাকে বিভিন্ন ধরনের মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন সিয়াম। এ ঘটনায় ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মিজবাউল হক মিজুর বিরুদ্ধে হামলার ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন তিনি।

ঘটনার পর নিজ ঈশা খাঁ হলে ফিরে অন্য সহপাঠী ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এবং ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান তিনি। এই বিষয়ে অভিযোগকারী মেরাজুল সিয়াম বলেন, আমি অভিযোগপত্র জমা দিয়েছি। প্রক্টর স্যার আমাকে পরে এই ব্যাপারে পরবর্তীতে দেখা করতে বলেছেন। সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আমি এই বিষয়ে আর কিছু বলতে চাচ্ছি না।

ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী সোহরাওয়ার্দী হলের ১০২ নং কক্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী মুগ্ধ বলেন, আমি ওই সময় রুমেই উপস্থিত ছিলাম। প্রথমে যখন সিয়াম জানালার সামনে এসেছিল আমি তখন খেয়াল করিনি। ওই সময় রুমে থাকা নাজমুল তাকে তার পরিচয় জিজ্ঞেস করে। কিন্তু উত্তরে সিয়াম কিছু বলে না। পরে যখন দেখে চিনতে পারলাম তখন তাকে ভিতরে বসতে বলি। তখনও নাজমুল সিয়ামকে তার নাম পরিচয় জিজ্ঞেস করছিল। কিন্তু সিয়াম কোনো উত্তর দিচ্ছিল না। এক পর্যায়ে তাদের মাঝে তর্কাতর্কি শুরু হয়। এবং তারা একে অপরকে আঘাত করে। নাজমুলের আঘাত সিয়ামের চোখের নিচে লাগে। এবং সে পরে পানি দিতে বাথরুমে চলে যায়। পরবর্তীতে আমি তাকে ডেকে এনে বিষয়টা সমাধান করার চেষ্টা করলে সে হলে যাওয়ার কথা বলে চলে যায়।

অন্যদিকে ওই ঘটনার রেশ ধরে পরের দিন গত ৪ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী হলের ভেটেরিনারি অনুষদের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইয়ামিনকে মারধরের অভিযোগ উঠে ঈশা খাঁ হলের কয়েকজন জুনিয়র শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে।

জানা যায়, গত ৪ নভেম্বর করিম ভবনে সোহরাওয়ার্দী হলের একজন শিক্ষার্থীকে আটক করে রাখা হয়। পরবর্তীতে তাকে ছাড়াতে এবং বিষয়টা সমাধান করতে সোহরাওয়ার্দী হলের কয়েকজন শিক্ষার্থী সেখানে উপস্থিত হন। তার মাঝে একজন ছিলেন ইয়ামিন। এক পর্যায়ে করিম ভবনের সামনের হোটেলে দুপুরে খাবার খাওয়ার সময় ঈশা খাঁ হলের কয়েকজন শিক্ষার্থী এসে তাকে মারধর শুরু করে। এই বিষয়ে ভুক্তভোগী ইয়ামিন প্রক্টর অফিসে অভিযোগ জানান।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ইয়ামিন বলেন, বিগত দিনের কোনো ঘটনা সম্পর্কেই অবগত ছিলাম না। ৩ তারিখে হলে ফেরার পথে যখন জানতে পারি অন্য হলের এক জুনিয়রকে আটক করা হয়। পরে তাকে ছাড়ানোর জন্যই আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হই। পরের দিন আমি করিম ভবনের সামনের হোটেলে খেতে যাই। সেই সময়ই সেখানে ঈশা খাঁ হলের প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন এসে আমার হলের নাম জানতে চায়। যখন তারা জানতে পারে আমি সোহরাওয়ার্দী হলের তখন তারা সবাই মিলে এলোপাথাড়ি ভাবে আমাকে মারতে শুরু করে।

সিয়ামের অভিযোগপত্রে তার নাম উল্লেখের সম্পর্কে তিনি জানান, ঘটনার পরেরদিন (৫ নভেম্বর) আমি জানতে পারি আমার বিরুদ্ধে মারপিঠের ইন্ধন দেয়ার অভিযোগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমি এই ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানতাম না, এমনকি আমি ওইদিন (৩ নভেম্বর) ঘটনার সময় হলেই উপস্থিত ছিলাম না। বিষয়টা এমন যে আমাকেই মারধর করে আমার নামেই মারপিটের অভিযোগ দেয়া হলো।

অভিযুক্ত নাজমুল হাসান ইমন বলেন, সিয়াম যখন আমাদের রুমে তাসনিমকে খুঁজতে আসে তখন আমি তার পরিচয় জানতে চাওয়ার জন্য বার বার নাম জিজ্ঞেস করি। কিন্তু সে সেটার উত্তর না দিয়ে আমাকে বিভিন্ন উস্কানিমূলক মন্তব্য করতে থাকে। এক পর্যায়ে কথা কাটাকাটির জেরে আমাদের মাঝে হাতাহাতি হয়।

অন্যদিকে অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা মেজবাউল হক মিজু বলেন, ঈশা খাঁ হলের ছেলেটি যে সময়ে তাকে মারার এবং আমাকে সোহরাওয়ার্দী হলে দেখার কথা বলেছে আমি সেসময় হলে উপস্থিতই ছিলাম না। হলের হাই রেজুলেশন সিসি ক্যামেরা আছে। কে কখন হলে ঢুকছে কখন বের হচ্ছে সবই দেখা যায়। ক্যামেরার ফুটেজ দেখলেই বিষয়টি প্রমাণিত হয়ে যাবে।

মেরাজুলকে মারধরের ঘটনায় তার ইন্ধনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, ঘটনা ঘটার পরে আমি জানতে পেরেছি। যাদের মধ্যে মারামারি হয়েছে তারা কেউই আমার পরিচিত না। আমি যতটুকু জানি মেরাজুলকে যে মারধর করেছে সে তারই বন্ধু। এবং সে ছাত্রদলের অন্যান্য নেতাকর্মী ও তাদের অনুসারীদের সাথে ঘোরাফেরা করে। আমি তাকে চিনিও না। এখানে আমি ইন্ধনদাতা কিভাবে হতে পারি। এই মিথ্যা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।

এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আবদুল আলীম বলেন, আমরা সিয়ামের অভিযোগপত্রটি পেয়েছি এবং ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন প্রমাণাদি আমরা খতিয়ে দেখছি। ঈশা খাঁ হলের জুনিয়র ছেলেরা সোহরাওয়ার্দী হলের একজন সিনিয়রকে মেরেছে এটারও অভিযোগ পেয়েছি। সকল বিষয় নিয়েই প্রক্টরিয়াল বডি তৎপর আছে। হলে যেনো ছাত্র শৃংখলা বজায় থাকে এর জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *