একজন মাঃ আদর্শ মানুষ গড়ার নেপথ্য কারিগর

Spread the love

একজন মাঃ আদর্শ মানুষ গড়ার নেপথ্য কারিগর

আদিত্য চৌধূরীঃ আজ ১০ মে। ক্যালেন্ডারের পাতায় আজ একটি বিশেষ দিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সবখানেই আজ মাতৃত্বের জয়গান। মাতৃত্ব এমন এক নিরবচ্ছিন্ন বন্ধন, যা প্রতি মুহূর্তে আমাদের অস্তিত্বের জানান দেয়।

মা কেবল একটি চরিত্র নন, তিনি একটি বিবর্তনশীল সত্তা। সময়ের সাথে সাথে তিনি বন্ধু হয়ে ওঠেন, কখনো কঠোর পথপ্রদর্শক, আবার কখনো জীবনযুদ্ধের সবচেয়ে বড় ঢাল। একটি গাছ যেমন তার শিকড়কে মাটির গভীরে গেঁথে রেখে ডালপালাকে আকাশের দিকে ছড়িয়ে দেয়, একজন মাও ঠিক তেমনি তার সন্তানদের ডানা মেলতে শেখান, কিন্তু নিজে সবসময় সেই মাটির মতো আঁকড়ে ধরে থাকেন ভিত্তিটাকে। এই যে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে অন্যকে গড়ে তোলার আনন্দ, এটাই মাতৃত্বের সবচেয়ে ইউনিক বা অনন্য দিক।

মাতৃত্ব কোনো দায়িত্বের নাম নয়, এটি পৃথিবীর একমাত্র নিঃস্বার্থ বিনিয়োগ, যেখানে বিনিময়ে মা কেবল সন্তানের এক চিলতে হাসি ছাড়া আর কিছুই প্রত্যাশা করেন না। সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, মা হলেন একটি পরিবারের সবকিছু, যা বাইরের কঠোর পৃথিবীর ঝাপটা থেকে ভেতরের মানুষগুলোকে আগলে রাখে।

একটি স্মার্টফোন হয়তো আপনাকে হাজারো তথ্য ও বিনোদন দিতে পারে, কিন্তু দিনশেষে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফেরার পর মায়ের সেই পরম মমতা মাখা ডাক কোনো প্রযুক্তি দিতে পারবে না। সভ্যতার ক্রমবিকাশে, মাতৃত্ব হলো পৃথিবীর শেষ প্রাচীন জাদু, যা এখনো অমলিন রয়ে গেছে।

আজকের যুগে মায়ের সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত হয়েছে। আমরা এমন মায়েদের দেখছি যারা ঘর সামলানোর পাশাপাশি কলম ধরছেন সাংবাদিকতায়, ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করছেন নতুন কোনো উদ্ভাবন নিয়ে, কিংবা নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশ-বিদেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠানে। আবার সেইসব মায়েদের কথা না বললেই নয়, যারা কোনো রক্তের সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও পরম মমতায় একটি অনাথ শিশুকে বড় করে তুলছেন। মাতৃত্ব আসলে একটি মানসিক অবস্থা, যা কেবল জন্মদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একজন মা যখন তার নিজের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো সন্তানের চোখের তারায় জ্বলজ্বল করতে দেখেন, তখন তার সেই ত্যাগ কোনো বিসর্জন নয়, বরং এক নতুন জীবনের অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। এটি যেন একটি অদৃশ্য উত্তরাধিকার, যা ডিএনএ-র চেয়েও বেশি প্রবাহিত হয় আদর্শ আর মূল্যবোধের মাধ্যমে।

রান্নাঘরের ধোঁয়া থেকে শুরু করে সন্তানের পরীক্ষার হলের বাইরে অধীর প্রতীক্ষা—এই প্রতিটি মুহূর্তেই তিনি একজন যোদ্ধা। পৃথিবীর বড় বড় সংঘাত বা রাজনীতির ভিড়ে মায়ের এই নিরব লড়াইগুলো হয়তো শিরোনাম হয় না, কিন্তু এই লড়াইগুলোই আসলে পৃথিবীর ভারসাম্য টিকিয়ে রেখেছে। মা হলেন সেই প্রকৌশলী, যিনি ইটের দালানকে একটি নীড় বা বাড়িতে রূপান্তর করেন।

আজকের এই দিনে আমরা হয়তো মাকে দামী উপহার দেই বা রেস্তোরাঁয় খেতে যাই। কিন্তু একজন মায়ের কাছে সবচেয়ে বড় উপহার হলো তার সন্তানের সাফল্য। পৃথিবীর সব ভাষাতেই ‘মা’ শব্দটি শুনতে প্রায় একইরকম। এর কারণ হয়তো এই যে, ভালোবাসা প্রকাশের বৈশ্বিক ভাষা একটাই, আর তা হলো মা।

মা দিবসের সার্থকতা তখনই আসবে, যখন আমরা বুঝতে পারব যে মায়ের ত্যাগ কোনো দিবসের ফ্রেমে বাঁধানো বিষয় নয়। তিনি হলেন সেই বটবৃক্ষ, যার ছায়া আমরা সবসময় অনুভব করি কিন্তু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভুলে যাই। এবারের মা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক, মাকে কেবল একদিন নয়, প্রতিটি দিনই ভালোবাসায় ও শ্রদ্ধায় সিক্ত রাখা। আজকের সূর্যটা যেন সেইসব মায়েদের সম্মানে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, যারা পর্দার আড়ালে থেকে আমাদের জীবনকে আলোকিত করে চলেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *