
সমুদ্রের গর্ভে কি হারিয়ে যাবে উপকূল? অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে বাংলাদেশ
প্রকৃতির লীলাভূমি বাংলাদেশ আজ এক অদৃশ্য শত্রুর মোকাবিলা করছে, যার নাম ‘সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি’। জলবায়ু পরিবর্তনের ঘাতক প্রভাবে হিমালয়ের বরফ গলা জল আর মহাসাগরের স্ফীতি আমাদের মানচিত্রের দক্ষিণভাগকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, সমুদ্রের উচ্চতা যদি এভাবে বাড়তে থাকে, তবে আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলাগুলোর একটি বড় অংশ লোনা পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে। এটি কেবল ভূখণ্ড হারানোর ভয় নয়, বরং এক বিশাল জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুত হওয়ার মানবিক বিপর্যয়।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ১৯টি জেলা রয়েছে, যেখানে দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ বাস করে। বিশ্বব্যাংক ও আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেল (IPCC)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যদি মাত্র ১ মিটার বৃদ্ধি পায়, তবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ১৭ শতাংশ ভূমি স্থায়ীভাবে পানির নিচে চলে যেতে পারে। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ভোলা এবং পটুয়াখালীর মতো জেলাগুলো এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে।
লবণাক্ততার নীল বিষ ও কৃষি সংকট
সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ার ফলে কেবল জমি তলিয়ে যাচ্ছে না, বরং লোনা পানি ভূখণ্ডের অনেক গভীরে ঢুকে পড়ছে। উপকূলীয় জেলাগুলোতে চাষাবাদের জমি এখন ‘লবণাক্ততার নীল বিষে’ আক্রান্ত। ধান চাষ অনুপযোগী হয়ে পড়ায় কৃষকরা বাধ্য হয়ে চিংড়ি ঘেরের দিকে ঝুঁকছেন, যা মাটির উর্বরতা আরও কমিয়ে দিচ্ছে। সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে, যার ফলে ওই অঞ্চলের নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসহ নানা চর্মরোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে।
হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর
আমাদের গর্বের সুন্দরবন আজ বহুমুখী সংকটে। সমুদ্রের লোনা পানি বনের গভীরে ঢুকে পড়ায় সুন্দরী ও গোলপাতার মতো গাছগুলো আগামরা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে বনের নিচু এলাকাগুলো তলিয়ে যাবে, যা রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ অসংখ্য বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত করবে। সুন্দরবন যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় উপকূলীয় জেলাগুলো রক্ষাকারী কোনো ঢাল পাবে না। এক অনিবার্য বাস্তবতা
প্রতিবছর নদী ভাঙন ও লবণাক্ততার কারণে হাজার হাজার মানুষ উপকূল ছেড়ে ঢাকা বা চট্টগ্রাম অভিমুখী হচ্ছে। এই ‘জলবায়ু শরণার্থীরা’ শহরের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। পৈত্রিক ভিটা ও জীবিকা হারিয়ে এসব মানুষ আজ নিজ দেশেই যাযাবর। উন্নয়ন সহযোগীদের মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে উপকূলীয় জেলাগুলো থেকে প্রায় ১ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে, যা হবে এই শতাব্দীর বৃহত্তম মানবিক সংকট।
বাংলাদেশ সরকার ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ (Delta Plan 2100) গ্রহণ করেছে, যা এই সংকট মোকাবিলায় একটি দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ। তবে কেবল পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন জরুরি।
উপকূলীয় জেলাগুলোতে আধুনিক ও শক্তিশালী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে। কৃষি বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত লবণসহিষ্ণু ধানের জাত প্রান্তিক কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। উপকূলজুড়ে সবুজ বেষ্টনী বা ম্যানগ্রোভ বনায়ন জোরদার করতে হবে যা মাটির ক্ষয় রোধ করবে।
বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য উন্নত দেশগুলোকে বাধ্য করতে আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের জোরালো কণ্ঠস্বর বজায় রাখতে হবে। উপকূলের কান্না আজ আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। সমুদ্রের গর্ভে আমাদের মানচিত্রের এক অংশ বিলীন হতে দেওয়া মানেই জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড দুর্বল হওয়া। সরকার, উন্নয়ন সংস্থা এবং সাধারণ নাগরিক—সবাইকে সম্মিলিতভাবে এই দুর্যোগ মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, উপকূল বাঁচলে বাঁচবে সুন্দরবন, আর সুন্দরবন বাঁচলে সুরক্ষিত থাকবে পুরো বাংলাদেশ।
মোঃ আবির আল হাসনাঈন
শিক্ষার্থী, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়





