চীন-ভারত ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ভারসাম্য

Spread the love

চীন-ভারত ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ভারসাম্য

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এখন পরিণত হয়েছে বিশ্ব-পরাশক্তির কেন্দ্রে, যেখানে চীন ও ভারত পরস্পর বিরোধী মনোভাব সম্পন্ন রাষ্ট্র। বর্তমানে উদিত পরাশক্তি চীনের হাতিয়ার অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ানো এবং ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোতে। প্রতিবেশী দেশ ভারত ও অন্যতম অর্থনৈতিক অংশীদার চীনের সাথে বাংলাদেশের তাল মিলিয়ে চলার ক্ষেত্রে বেশ ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল অবলম্বন করছে।

বঙ্গোপসাগরের নিকট অবস্থান বাংলাদেশের। ভারত ও চীনের কাছে বঙ্গোপসাগর খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে ভারত, তার পূর্ব উপকূল ও আন্দামান-আর নিকোবার দ্বীপ রাডার স্থল ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। এতে চীনের প্রবেশ ঠেকাতে জোট গঠন বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশের সাথে। যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, ভারতের কোন নীতির মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধিতে বঙ্গোপসাগর ভূমিকা রাখছে? সোজা কথায় উত্তর হবে “অ্যাক্ট ইস্ট” নীতির মাধ্যমে। অপরদিকে, চীন ‘স্ট্রেইট অফ পার্ল” কৌশলের মাধ্যমে কিয়াউকফিউ বন্দর এবং চট্টগ্রাম বন্দরের মতো অঞ্চলে বন্দর ও নৌ উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। চীনের ৮০% তেল যেহেতু মালাক্কা প্রণালী দিয়ে চলাচল করে, ফলে কোন রকম যুদ্ধ বা সংকটে মালাক্কা সংকট যাতে না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখে। ফলে ভারত ও চীন দুই দেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব, সামুদ্রিক কৌশল ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে বাংলাদেশের নিকটবর্তী এ অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের বেল্ট এন্ড ইনিশিয়েটিভ, বেইজিংয়ের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং অর্থনৈতিক করিডোরের মতো বৃহত্তর প্রকল্প অর্জনের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করছে। কৌশলটি যেহেতু আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করে থাকে যা অবশ্যই ভারতের ঐতিহ্যগত প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করে। আবার, অবকাঠামোগত উন্নয়ন করালেও পিছে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো, রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ানো বিষয়টি সমালোচকরা তুলে ধরেছে।

ভারতের জন্য বাংলাদেশ কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সব দিক দিয়েই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশ। ৪,০৯৬ কি.মি দীর্ঘ সীমান্তে দুই দেশের চোরাচালান, মানব পাচার ও অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে প্রধান স্বার্থ। এছাড়া বাণিজ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর হচ্ছে। দুই দেশের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তিস্তা পানি বণ্টন সমস্যা, যা এখনো অমীমাংসিত। এছাড়াও আমাদের ও ভারতের মধ্যে ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিগত গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান, যা জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগকে শক্তিশালী করে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত “সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’ এই নীতি বাংলাদেশের কূটনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিতে দু দেশের সাথে ভারসাম্য নীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ধারণা যার অর্থ হলো কোনো একটি দেশের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে বিকল্প কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সক্রিয় রাখা, যাতে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলা করা যায়। বাংলাদেশ ভারত বা চীন-কোনো রাষ্ট্রের সাথেই একচেটিয়া জোটে আবদ্ধ হয়নি। বরং বাংলাদেশ উভয় দেশের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী কৌশলগত সুবিধা গ্রহণের চেষ্টা করে। ফলে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার মধ্যেও বাংলাদেশ নিজের কূটনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হয়।

ভারত ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যে নীতি অনুসরণ করছে, তা কৌশলগত সুবিধা আনলেও এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে একাধিক জটিল ঝুঁকি ও চ্যালেজ, যেখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেজগুলোর একটি হলো প্রধান শক্তিগুলোর চাপ মোকাবিলা করা। বাংলাদেশ একইসাথে ভারত ও চীনের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখায় উভয় পক্ষই ভিন্নধর্মী কৌশলগত প্রত্যাশা ও চাপ তৈরি করে। যেকোনো একটি পক্ষকে সামান্য বাড়তি সুবিধা দিলেও অন্য পক্ষের অসন্তোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণ। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার কোয়াড জোট এবং চীনের মধ্যে কৌশলগত ও সামরিক প্রতিযোগিতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশকে একদিকে চীনের সন্দেহ এড়াতে হয়, অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্ব ও ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগও বিবেচনায় রাখতে হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি

অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ দ্বারাও গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। কোনো সরকার ভারতের প্রতি অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ বলে মনে হলে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ও জনমতের সমালোচনার মুখে পড়তে বা চীনের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার বিষয়েও অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা যায়। এতে সরকারকে শুধু আন্তর্জাতিক ভারসাম্য নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনমতকেও সতর্কতার সাথে পরিচালনা করতে হয়। সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি হলো বাংলাদেশ যেন একটি ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে না ওঠে।

এই ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, চীন বা ভারতের মতো একক কোনো দেশের ঋণের ওপর অতিনির্ভরশীলতা কমিয়ে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, এআইআইবি এবং অন্যান্য বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সংস্থা থেকে দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্পসুদের ঋণ সংগ্রহে গুরুত্ব দিতে হবে। এতে রাজনৈতিক শর্তের ঝুঁকি কমবে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। দ্বিতীয়ত, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমানো সম্ভব। বাংলাদেশকে শুধু ভারত ও চীনের বাজারের ওপর নির্ভর না করে আসিয়ান, মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব ইউরোপের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্প্রসারণে মনোযোগ দিতে হবে। তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কোনো একক দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানো। নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান, বিকল্প জ্বালানি উৎস এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। পাশাপাশি খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বিকল্প উৎস প্রস্তুত রাখলে আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংকটের প্রভাব কমানো সম্ভব হবে। সবশেষে, বাংলাদেশকে তার ভৌগোলিক অবস্থানকে কৌশলগত সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। ভারত ও চীনের জন্য বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। তাই ট্রানজিট সুবিধা, সমুদ্রবন্দর ব্যবহার এবং আঞ্চলিক করিডোরের বিনিময়ে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, বৃহৎ বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার মতো অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করতে হবে। অর্থাৎ, ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে দক্ষ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করাই হবে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত সাফল্যের মূল ভিত্তি।

সুমাইয়া পারভীন হৃদি

শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *