কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি: কারণ, দায় ও প্রতিকারের রূপরেখা
সাইমুর রহিম
অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম
বিশ্ববিদ্যালয়
নগরজীবনের একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা হলো কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার। এই প্রবণতাকে আবেগ দিয়ে নয়, তথ্য ও বিশ্লেষণ দিয়ে বোঝা প্রয়োজন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীর ৫০টি থানা এলাকায় ১১৮টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়, যার মধ্যে মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও উত্তরায় কেন্দ্রীভবন তুলনামূলক বেশি। প্রতিটি দলে সদস্যসংখ্যা সাধারণত সাত থেকে বিশ এবং বয়স প্রায় ১৪ থেকে ২০ বছর। অভিযোগের ধরনও বৈচিত্র্যময়: ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, জমি দখল, ভাড়াটে হামলা ও খুন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আদাবরে অভিযানকালে এক পুলিশ সদস্য আহত হন, যার জের ধরে ১০২ জন গ্রেপ্তার হয়। চলতি বছরের এপ্রিলে রায়েরবাজারে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সংঘর্ষে একজনের মৃত্যু হয়। আগস্টে চট্টগ্রামে এক স্কুলছাত্রের মৃত্যুর ঘটনায় চার শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার হয়েছে। মুক্তিপণের অভিযোগটি তদন্তাধীন, তাই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের এখতিয়ারভুক্ত।
তথ্য ব্যাখ্যায় সতর্কতা জরুরি। ২৭-২৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের বিশেষ অভিযানে আটক ৩৫৪ কিশোরের মধ্যে ২৯৩ জনকে প্রমাণের অভাবে অভিভাবকদের কাছে ফেরত দেওয়া হয়, আর ৬১ জনের বিরুদ্ধে প্রাথমিক সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আটক হওয়া ও অপরাধী প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। আবার ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুরে আগের তিন মাসের তুলনায় কিশোর গ্যাং, মাদক ও ছিনতাই কমেছে। সুতরাং একক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সারা দেশে অপরাধ বাড়ার সিদ্ধান্ত টানা যুক্তিসংগত নয়। তবে সমস্যা যে বিদ্যমান এবং তা সমাজের সাধারণ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, সেটিও সমান সত্য।
কারণ অনুসন্ধানে অপরাধবিজ্ঞানের একাধিক তত্ত্ব প্রাসঙ্গিক। রবার্ট মার্টনের স্ট্রেইন তত্ত্ব অনুযায়ী, সামাজিকভাবে স্বীকৃত লক্ষ্য অর্জনের বৈধ পথ সংকুচিত হলে কেউ কেউ বিকল্প পথ বেছে নেয়। এডুইন সাদারল্যান্ডের ডিফারেনশিয়াল অ্যাসোসিয়েশন তত্ত্বে অপরাধ আচরণ শেখা হয় ঘনিষ্ঠ সঙ্গীদের মাধ্যমে, যা গ্যাং সংস্কৃতির বিস্তারকে ব্যাখ্যা করে। রুটিন অ্যাক্টিভিটি তত্ত্বে অপরাধ ঘটে প্রেরণাসম্পন্ন অপরাধী, উপযুক্ত লক্ষ্য ও কার্যকর নজরদারির অনুপস্থিতির সমন্বয়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক মাধ্যমে ক্ষমতা ও পরিচিতির প্রদর্শন, যা কিশোরদের কাছে মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
তবে কাঠামোগত চাপ ব্যাখ্যা দিলেও ব্যক্তিগত দায় মুছে দেয় না। একই সামাজিক পরিস্থিতিতে বেড়ে ওঠা অধিকাংশ কিশোর অপরাধে জড়ায় না। অপরাধের ব্যাখ্যা ও তার সমর্থন দুটি ভিন্ন বিষয়, আর ভুক্তভোগীর ক্ষতি আমাদের নীতি-আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুতর উদ্বেগের জায়গা হলো প্রাপ্তবয়স্কদের ভূমিকা। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, কখনো কখনো বয়স্ক অপরাধীরা কিশোরদের ব্যবহার করে, কারণ আইনে তাদের শাস্তির মাত্রা তুলনামূলক কম। অর্থাৎ ঝুঁকি বহন করে কিশোর, আর সুবিধা ভোগ করে আড়ালের শক্তি।
বিচারব্যবস্থার চিত্রও পর্যালোচনার দাবি রাখে। ইউনিসেফের তথ্যে শিশুদের সংশ্লিষ্ট ২৩ হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন, আর ২০২৬ সালের অন্য একটি প্রতিবেদনে এ সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। উৎস ও সময় ভিন্ন হওয়ায় দুটি সংখ্যাকে এক করে দেখা যাবে না, তবে উভয়ই দীর্ঘসূত্রতার ইঙ্গিত দেয়। দেশে অপরাধের দায়ের ন্যূনতম বয়স ৯ বছর, যেখানে জাতিসংঘের শিশু অধিকার কমিটি ১৪ বছরের সুপারিশ করেছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্যে মোট ১৫ হাজার ৯৮ জন প্রবেশন ও পুনর্বাসনসংক্রান্ত সেবা পেলেও ডাইভারশনের আওতায় এসেছে ৫০৩ জন শিশু। এই ব্যবধান বিকল্প ব্যবস্থার সীমিত প্রয়োগ নির্দেশ করে।

প্রতিকারের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমুখী কৌশল প্রয়োজন। প্রথমত, কিশোরদের ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্ক নেতৃত্ব ও তাদের স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতার কাঠামো আইনের আওতায় আনা অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, গুরুতর অপরাধের বিচার দ্রুত নিষ্পন্ন করতে হবে, কারণ শাস্তির নিশ্চয়তা ও দ্রুততা তীব্রতার চেয়ে বেশি প্রতিরোধমূলক বলে ডিটারেন্স তত্ত্বে ধরা হয়। তৃতীয়ত, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, গোয়েন্দা নজরদারি এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপদে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার। চতুর্থত, প্রথমবার ও লঘু অপরাধে জড়ানো শিশুদের জন্য ডাইভারশন, কাউন্সেলিং ও সংশোধনমূলক কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন, যা ছাড় নয়, বরং পুনরাবৃত্তি রোধের কৌশল। পঞ্চমত, পরিবার ও বিদ্যালয়ের ভূমিকা জোরদার করতে হবে, যার মধ্যে অভিভাবকদের সচেতনতা ও শিক্ষার্থীদের জন্য মনোসামাজিক সহায়তা অন্তর্ভুক্ত। সবশেষে, অভিযান পরিচালনায় যথাযথ প্রক্রিয়া মানতে হবে, যাতে নির্দোষ কিশোর হয়রানির শিকার না হয় এবং লেবেলিং তত্ত্বের সতর্কবার্তা অনুযায়ী অপরাধী তকমা নতুন অপরাধের কারণ না হয়।
কিশোর গ্যাং সমস্যার সমাধানে কেবল কঠোরতা বা কেবল সহানুভূতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন জবাবদিহি ও পুনর্বাসনের সুষম প্রয়োগ, যেখানে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা অগ্রাধিকার পাবে এবং সংশোধনযোগ্য কিশোরের জন্য ফেরার পথও খোলা থাকবে।
