রাবিপ্রবির নামে ফেইক ও বট আইডিতে সয়লাব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারের বিস্তারও বেড়েছে। রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবিপ্রবি) নাম ব্যবহার করেও পরিচালিত কিছু ফেইক আইডি ও পেজের মাধ্যমে এমন কর্মকাণ্ড বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, এসব অ্যাকাউন্টের আড়ালে থাকা ব্যক্তিরা কখনো রাজনৈতিক স্বার্থে, আবার কখনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে হেয়প্রতিপন্ন করতে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পোস্টে অসম্মানজনক মন্তব্য, ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে মানহানিকর লেখা এবং যাচাই ছাড়াই গুজব প্রচারের মতো কর্মকাণ্ডে এসব অ্যাকাউন্ট ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বট আইডি’ নামে পরিচিত এসব অ্যাকাউন্ট সাধারণত প্রকৃত পরিচয় গোপন রেখে পরিচালিত হয়। রাবিপ্রবি-সংক্রান্ত বিভিন্ন ফেসবুক পোস্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ‘ইনসাইড আরএমএসটিইউ’, ‘আমার আরএমএসটিইউ—আমার রাবিপ্রবি’, ‘আরএমএসটিইউ নিউজ—রাবিপ্রবি সংবাদ’, ‘পিডি বলছি’, ‘আরএমএসটিইউ এক্সপোজ’, ‘মি. বিন’ ও ‘রাবিপ্রবি সমাচার’সহ কয়েকটি আইডি বা পেজ নিয়মিত মন্তব্য ও পোস্ট করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংগঠন, শিক্ষার্থী, ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ইস্যু নিয়ে এসব প্ল্যাটফর্মে মন্তব্য করতে দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মন্তব্যের ভাষা অসম্মানজনক, আক্রমণাত্মক ও বিদ্বেষমূলক হয়ে ওঠে।
এ ছাড়া এসব পেজ বা আইডি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পোস্ট ছড়ানো হচ্ছে বলেও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ দাবি করেছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ফেইক আইডির মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে মানহানিকর পোস্ট দেওয়া হচ্ছে। কোনো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য যাচাই না করেই পোস্ট প্রকাশ এবং পরে কমেন্টের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে ব্যক্তিগত সম্মানহানি, শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাঁধন, রাবিপ্রবি ইউনিটের সভাপতি হাসিবুর রহমান মিশকাত বলেন, “আমার মনে হয়, এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুরুতেই প্রশাসন গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করলে আজকের পরিস্থিতি হয়তো তৈরি হতো না। তাই ভবিষ্যতে যেকোনো সমস্যা শুরুতেই শনাক্ত করে নিরপেক্ষভাবে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। বাঁধনের একজন শিক্ষার্থী প্রতিনিধি হিসেবে আমার দাবি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত মর্যাদা দুটোই নিশ্চিত করতে হবে এবং যেকোনো সিদ্ধান্ত তথ্য-প্রমাণ ও নীতিমালার ভিত্তিতে নিরপেক্ষভাবে নিতে হবে। এতে শিক্ষার্থীদের প্রশাসনের প্রতি আস্থা আরও শক্তিশালী হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো: আরিফুল ইসলাম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তবুদ্ধি চর্চার স্থান হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বা ছদ্মনাম ব্যবহার করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাইবার বুলিং ও মানহানি করা অত্যন্ত নিন্দনীয়। তবে অপপ্রচার রোধের পাশাপাশি সুস্থ ও গঠনমূলক সমালোচনার মুক্ত পরিবেশ বজায় রাখা আবশ্যক। এ পরিস্থিতি নিরসনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত দ্রুত বেনামী পেইজগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং একটি ‘সাইবার বুলিং নিরোধ সেল’ গঠন করে জড়িতদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা।”
রাবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মোঃ আয়নুল ইসলাম বলেন, “রাবিপ্রবির ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে পরিমাণ কটূক্তি, অশ্লীলতা ও আক্রমণাত্মক মন্তব্যের ছড়াছড়ি, দ্রুত এসবের লাগাম টানা উচিত। আমরা যারা সাংবাদিকতা করি তারাও বিব্রতবোধ করি এসব কর্মকান্ডে। আর সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা এসব পেজের কিংবা আইডির পোস্টকে নিউজ হিসেবে বিবেচনা করে, তাদের উদ্দেশ্যে আহবান থাকবে একটি তথ্য গ্রহন করার পূর্বে দেখে নিবেন সেটি কোন নিউজ মিডিয়াতে/পত্রিকাতে প্রচার হয়েছে।”
ডিজিটাল মাধ্যমে গুজব ছড়াতে বট ও ভুয়া অ্যাকাউন্টের ব্যবহার বাংলাদেশে নতুন নয়। গবেষণা ও পর্যবেক্ষণমূলক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সংবেদনশীল বিষয়ে উসকানিমূলক মন্তব্য ছড়ানো এবং কৃত্রিমভাবে কোনো পোস্টের জনপ্রিয়তা বা জনমত তৈরির জন্যও ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য দেখলেই তা সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়। তথ্যের উৎস, প্রকাশের সময়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে কি না, এসব বিষয় যাচাই করা জরুরি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তা যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। মানহানিকর বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট দেখলে সেটি ছড়িয়ে না দিয়ে প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট করারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মোঃ ফখরুদ্দিন বলেন, “রাবিপ্রবির নাম, পরিচয় বা ভাবমূর্তি ব্যবহার করে কোনো ফেইক আইডি বা পেইজ পরিচালিত হয়ে থাকলে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হবে। প্রক্টরিয়াল বডির পক্ষ থেকে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে এ ধরনের আইডি বা পেইজের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বা সংশ্লিষ্ট কারও বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর বা আপত্তিকর কোনো তথ্য প্রচার করা হলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধি ও প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে যেসব আইডি ও পেজের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো কারা পরিচালনা করেন বা তাদের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত হয়েছে কি না, এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলোর পেছনে কারা রয়েছেন এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটা, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
