সাইবার অপারাধের ফাঁদে :আজকের তরুণ প্রজন্ম

Spread the love

সাইবার অপারাধের ফাঁদে :আজকের তরুণ প্রজন্ম

বর্তমানে প্রযুক্তি ছাড়া আমাদের একটা দিনও চলা সম্ভব নয়। আমাদের তরুণরাই মূলত দেশকে নতুন এক ডিজিটাল যুগের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই আলো ঝলমলে প্রযুক্তির একটা অন্ধকার দিকও আছে, যা এখন আমাদের চারপাশের পরিবেশকে দিন দিন ক্ষতিকর করে তুলছে। আর সেই অন্ধকারের নাম ‘সাইবার ক্রাইম’ বা ইন্টারনেট দুনিয়ার অপরাধ। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা অনলাইন গেমের জগতে আমাদের সন্তানেরা আজ যেভাবে অপরাধের শিকার হচ্ছে, তা প্রত্যেকপরিবারের কাছে এখন এক আতঙ্কের নাম।

এই সাইবার অপরাধ এখন আর শুধু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হ্যাক বা টাকা চুরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটা এখন ঢুকে পড়েছে সাধারণ ছেলে-মেয়েদের শোবার ঘর পর্যন্ত। ভুয়া আইডি খুলে হেনস্তা করা, আইডি হ্যাক করা কিংবা ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় ও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে প্রতিদিন অসংখ্য তরুণ-তরুণী মানসিকভাবে শেষ হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি দেশের একটি জাতীয় পত্রিকায় আসা একটা ঘটনা আমাদের সবার চোখ খুলে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুত্ব করার পর এক কলেজছাত্রীর সাধারণ ছবি এআই (AI) প্রযুক্তির সাহায্যে নগ্ন বানিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা হয়। লোকলজ্জা ভয়ে আর তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় মেয়েটি একপর্যায়ে নিজের জীবনটা শেষ করে পেলতে বাধ্য হয়। এটা কোনো কাল্পনিক বা ভুঁয়া খবর নয়; আমাদের সমাজে প্রতিদিন এমন শত শত মেয়ে এই নীরব যন্ত্রণা সহ্য করছে। সামাজিক মান-সম্মানের ভয় আর আইনি জটিলতার কথা ভেবে অনেকেই মুখ খোলে না, যার শেষ পরিণতি হয় এমন সব আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

কিন্তু এই সর্বনাশের শুরুটা কোথায়? একটু চিন্তা করে দেখলে বুঝবেন, আমাদের অসচেতনতা আর পরিবারের উদাসীনতাই এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। অনেক বাবা-মা-ই জানেন না যে তাদের সন্তান মোবাইল হাতে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠিক কী করছে বা কার সাথে মিশছে। অন্যদিকে, বয়সের কৌতুহল আর ইন্টারনেটে রাতারাতি জনপ্রিয় হওয়ার লোভে কিশোর-কিশোরীরা নিজের অজান্তেই অনেক ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি অনলাইনে শেয়ার করে ফেলে। আর এই সুযোগটাই নেয় ওত পেতে থাকা অপরাধীরা।

এখানে আমাদের আরও একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে—আমাদের সন্তানেরা যে শুধু সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে তা কিন্তু নয়; অনেক সময় তারা নিজেরাও অজান্তে অপরাধী হয়ে উঠছে। কারো পোস্টে গিয়ে নোংরা মন্তব্য করা, অনুমতি ছাড়া কারো ছবি নিয়ে ট্রল করা বা শেয়ার করা যে একটা বড় শাস্তিযোগ্য অপরাধ, সেটা আমাদের তরুণদের অনেকের কাছে অজানা। আইনের ভয় বা সঠিক ধারণা না থাকায় কৌতুহলের বশে অনেকেই নিজের সুন্দর ভবিষ্যৎটা ধ্বংস করে ফেলছে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে এখনই সবাইকে একসাথে এগিয়ে আসতে হবে। সবার আগে পরিবারকেই ঢাল হতে হবে। সন্তানদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যেন যেকোনো বিপদে তারা সবার আগে বাবা-মায়ের কাছে এসে মন খুলে তাদের বিষয়টি শেয়ার করতে পারেব। দ্বিতীয়ত, স্কুল-কলেজগুলোতে নিয়মিত নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের নিয়মকানুন শেখাতে হবে। এগুলোকে পাঠ্যপুস্তকের অংশ করা এখন সময়ের দাবি।

পাশাপাশি, পুলিশ ও আইনি প্রক্রিয়াকে আরও সহজ এবং ভুক্তভোগীদের জন্য নিরাপদ করতে হবে। কোনো ভুক্তভোগী মেয়ে যাতে নিজের পরিচয় ফাঁসের ভয় না পেয়ে শতভাগ ভরসা নিয়ে পুলিশের ‘সাইবার ক্রাইম ইউনিট’-এ অভিযোগ জানাতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তিকে আমরা জীবন থেকে বাদ দিতে পারব না, কিন্তু এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের সন্তানদের মেধা ও ভবিষ্যৎ সাইবার অপরাধের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার আগেই পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে এক হয়ে সুরক্ষার প্রাচীর গড়ে তুলতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *