পতাকায় কালেমা তাইয়্যেবা, আমাদের এই বাণী কাউকে কোনোদিন থামতে দেয়নি, আমরাও থামবো না”— কবি আল মাহমুদ

Spread the love

“আমাদের পতাকায় কালেমা তাইয়্যেবা, আমাদের এই বাণী কাউকে কোনোদিন থামতে দেয়নি, আমরাও থামবো না”— কবি আল মাহমুদ

৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ; দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকারবিরোধী লেখায় গ্রেফতার ও কারাবন্দি — কবি আল মাহমুদের জন্মদিন আজ

ঢাকা, ১১ জুলাই: আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের জন্মদিন আজ। ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতৃপ্রদত্ত নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, শিশুসাহিত্য ও সাংবাদিকতা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন স্বতন্ত্র অবদান। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে সক্রিয় থেকে তিনি আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিক, চেতনা ও বাকভঙ্গিতে সমৃদ্ধ করেছেন।

১৯৫০-এর দশকেই সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর আত্মপ্রকাশ। ভাষা আন্দোলনের চেতনা, বাঙালির জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক আন্দোলন, অর্থনৈতিক শোষণ এবং তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর লেখনী ছিল সোচ্চার। তাঁর কবিতা ও গদ্যে যেমন গ্রামীণ জনজীবন, নদী, লোকঐতিহ্য ও প্রেম উঠে এসেছে, তেমনি স্থান পেয়েছে স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা ও সাংস্কৃতিক চেতনা।

সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে ১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকায় আসেন। প্রথমে দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফরিডার হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু করেন। পরে সাপ্তাহিক কাফেলা পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সাংবাদিকতায়ও তিনি দ্রুত পরিচিতি লাভ করেন।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ভারতে গিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যুক্ত থেকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে তুলে ধরতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

স্বাধীনতার পর তিনি সরকারবিরোধী দৈনিক গণকণ্ঠ-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পত্রিকায় প্রকাশিত সরকারবিরোধী লেখার কারণে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং প্রায় এক বছর কারাবন্দি থাকতে হয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতার ইতিহাসে এ ঘটনাটি বিশেষভাবে আলোচিত।

কবি হিসেবে আল মাহমুদের উত্থান ঘটে লোক লোকান্তর (১৯৬৩) প্রকাশের মাধ্যমে। এরপর কালের কলস (১৯৬৬), সোনালী কাবিন (১৯৭৩) এবং মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারির কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। বিশেষ করে সোনালী কাবিন বাংলা কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।

কবিতার পাশাপাশি ছোটগল্প ও উপন্যাসেও তিনি সমান কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ পানকৌড়ির রক্ত এবং উপন্যাস কবি ও কোলাহল পাঠকমহলে প্রশংসিত হয়। সাহিত্যজীবনের পরবর্তী পর্যায়ে তাঁর রচনায় স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা এবং ইসলামী ঐতিহ্যের নানা অনুষঙ্গ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা তাঁকে নিয়ে সাহিত্যাঙ্গনে নানা আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেয়।

আল মাহমুদ বাংলা কবিতায় আঞ্চলিক শব্দ, লোকজ উপমা, নদীমাতৃক বাংলার প্রকৃতি, কৃষিজীবন, চরাঞ্চলের মানুষ এবং প্রেমকে নতুন মাত্রায় উপস্থাপন করেছেন। তাঁর কাব্যভাষা আধুনিক বাংলা সাহিত্যে এক স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করেছে।

১৯৬৮ সালে লোক লোকান্তর ও কালের কলস কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেন। পরবর্তীতে তিনি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৯৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

ব্যক্তিজীবনে তাঁর সহধর্মিণী ছিলেন সৈয়দা নাদিরা বেগম। ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তবে তাঁর সাহিত্যকর্ম, মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা, সাংবাদিকতার সাহসী অবস্থান এবং বাংলা ভাষার প্রতি নিবেদিত সৃষ্টিশীলতা তাঁকে আজও বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী কবি হিসেবে স্মরণীয় করে রেখেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *