
একুশ শতকের পৃথিবীতে মানবসভ্যতা যখন প্রযুক্তির শিখরে, ঠিক তখনই প্রকৃতির এক নীরব প্রতিশোধের মুখে আমরা দাঁড়িয়ে। ‘বৈশ্বিক উষ্ণায়ন’ শব্দটি এখন আর কেবল বিজ্ঞানীদের গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নেই; এর আঁচ লাগছে আমাদের ফসলের মাঠে, উপকূলের নোনা পানিতে আর শহরের অসহনীয় তাপমাত্রায়। হিমালয়ের বরফ গলা থেকে শুরু করে মেরু অঞ্চলের হিমশৈল ধসে পড়া, সবই ইঙ্গিত দিচ্ছে এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের। আর এই বৈশ্বিক দুর্যোগের সম্মুখ সারিতে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ।
শিল্পবিপ্লবের পর থেকে উন্নত দেশগুলোর অনিয়ন্ত্রিত কার্বন নিঃসরণ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। গ্রিনহাউস গ্যাসের চাদরে ঢাকা পড়ছে পৃথিবী, যার ফলে সূর্যের তাপ ফিরে যেতে পারছে না। এর ফলে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। নাসার তথ্যমতে, গত এক শতাব্দীতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৮-৯ ইঞ্চি বেড়েছে। বাংলাদেশের মতো নিচু বদ্বীপের জন্য এর প্রতিটি ইঞ্চি মানেই কয়েক হাজার হেক্টর জমি নোনা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া।
বিপদের সংকেত জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি সূচকে বাংলাদেশ বরাবরই প্রথম সারিতে থাকে। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান এবং অধিক জনসংখ্যা এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সমুদ্রের পানি বাড়ার ফলে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে নোনা পানি ঢুকে পড়ছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে ধান চাষ, সুপেয় পানির অভাবে দেখা দিচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি।
এখন আর কার্তিক মাসে শীতের দেখা মেলে না, আবার চৈত্র মাসে শুরু হয় অকাল বন্যা। অতিবৃষ্টি আর দীর্ঘস্থায়ী খরা কৃষকের ক্যালেন্ডার ওলটপালট করে দিচ্ছে। আইলা, মহাসেন, মোখা বা রেমালের মতো ঘূর্ণিঝড়গুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও ঘনঘন আঘাত হানছে। বাস্তুচ্যুত ‘জলবায়ু শরণার্থী’
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সবচেয়ে মানবিক বিপর্যয় হলো ‘জলবায়ু শরণার্থী’। বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারে। গ্রাম হারানো এই মানুষগুলো শেষ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিচ্ছে শহরের বস্তিগুলোকে, যা নগরায়নের ওপর সৃষ্টি করছে অসহনীয় চাপ। আমাদের প্রাকৃতিক দেয়াল সুন্দরবনও আজ হুমকির মুখে। সমুদ্রের উচ্চতা বাড়লে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণসহ অসংখ্য বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল পানির নিচে চলে যাবে। সুন্দরী ও গরান গাছের শ্বাসমূল নোনা পানিতে ডুবে থাকায় বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যা আমাদের প্রাকৃতিক সুরক্ষা কবচকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
উষ্ণায়ন রোধে বাংলাদেশের দায় খুব নগণ্য হলেও ক্ষতির শিকার আমরাই সবচেয়ে বেশি। তবে হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপকভাবে ম্যানগ্রোভ বন তৈরি করা এবং দেশজুড়ে বৃক্ষরোপণকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়া। লবণাক্ততা সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন এবং ভাসমান কৃষির মতো আদি ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌর ও বায়ু শক্তির ব্যবহার বাড়ানো জলবায়ু সম্মেলনে (COP) উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ‘ক্লাইমেট ফান্ড’ আদায়ে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা বজায় রাখা। হতে পারে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের পদক্ষেপ। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি মানবাধিকার ইস্যু। আজ যদি আমরা সচেতন না হই, তবে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। প্রকৃতিকে জয় করা নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে সন্ধি করে চলাই হবে আমাদের আগামীর মূলমন্ত্র। মনে রাখতে হবে, পৃথিবীটা আমাদের পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পাওয়া সম্পত্তি নয়, বরং পরবর্তী প্রজন্মের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ। সেই ঋণ শোধ করার সময় এখনই।

মো: আবির আল হাসনাঈন
শিক্ষার্থী, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়





